লেখক: আসাম্বর ॥
পারুর ‘অজাত’ সন্তান পেটে আসার খবরটা যেন আগুনের মতো চারপাশের গঞ্জে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। রাত পোহাতেই পারুদের উঠানে চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়। কেউ আসছে তামাশা দেখতে, কেউবা উপহাস করতে। গ্রামের কিছু মাতব্বর গোছের মানুষ বিষোদ্গার করে বলতে লাগল, “এই কুলাঙ্গার মেয়ের পাপে এই তল্লাটে ভগবানের গজব নামবে। কলেরা-বসন্ত আর দুর্ভিক্ষে গ্রাম উজাড় হয়ে যাবে, মাঠে ফসল ফলবে না।” মানুষের অভিশাপ আর কুৎসায় আকাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
গ্রামের মোড়লদের হুকুমে পারুর বাবা-মাকে ইউনিয়ন পরিষদে তলব করলেন চেয়ারম্যান সাহেব। সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো- তিন দিনের মধ্যে পারুকে গ্রামছাড়া করতে হবে। নিরুপায় বৃদ্ধ বাবা সমাজের রক্তচক্ষুর কাছে মাথা নত করলেন। রাতের আঁধারে কলিজার টুকরো মেয়েকে নিয়ে রওনা হলেন অজানার উদ্দেশ্যে। শহর-গঞ্জ থেকে অনেক দূরে, এক শ্মশানতুল্য নিঝুম বনের ধারে, খাল-খন্দে ভরা রাস্তার পাশে পারুকে একা ফেলে রেখে বাবা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন।
এদিকে পারুর মা মেয়ের শোকে পাথর হয়ে উঠানে পড়ে আছেন। অনাহারে-অর্ধাহারে কঙ্কালসার দেহটা যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। পারুর বাবা যখন টলতে টলতে বাড়ি ফিরলেন, দেখলেন চারপাশ অন্ধকার। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, শরীর হিম হয়ে আসছে। এক ফোঁটা জল মুখে দেওয়ার মতো কেউ নেই পাশে। পারুর মা ইশারায় স্বামীকে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু কথা সরল না। কয়েকটা দীর্ঘ হিক্কা তুলে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমালেন। স্ত্রীর লাশের পাশে পারুর বাবাও প্রায় সংজ্ঞাহীন, যমদূত যেন তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে।
অন্যদিকে, গহীন প্রান্তরে পারু একা। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, মাঝে মাঝে শিয়ালের হাঁক আর অশুভ পাখির ডাক। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা আরও গা ছমছমে হয়ে উঠেছে। পারু ডুকরে কেঁদে উঠল। ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে লাঠিতে ভর দিয়ে এক কুঁজো বুড়িকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। কাঁধে তার ভিক্ষার ঝুলি। কাছে এসে বুড়ি মায়ামাখা স্বরে শুধাল, “কিরে বেটি? এই ঘোর অমানিশায় তুই এখানে একলা কেন? এই ঠাঁই তো ভালো না, এখানে ডাইনি-পেত্নীদের আড্ডা। চল আমার সাথে।”
সেই ভিক্ষুক বুড়ির বস্তিতে আশ্রয় হলো পারুর। সব শুনে বুড়ি অভয় দিয়ে বলল, “তোর কেউ নেই, আমারও কেউ নেই। আজ থেকে তুই আমার কাছেই থাকবি। আমি ভিক্ষা করে হলেও তোকে খাওয়াব।”
দিন যায়, পারুর মনে নূর সাহেবের জন্য হাহাকার বাড়ে। সে ভাবে, “মরার আগে যদি একটিবার তার দেখা পেতাম! সে যে আমায় কত ভালোবাসত, কত যত্নে আগলে রাখত, তা আজ এই দূরবস্থায় পড়ে হাড়হিমে টের পাচ্ছি।” আকাশের দিকে তাকিয়ে পারু প্রার্থনা করে, “ভগবান, স্বর্গের সুখ চাই না, জন্মের সব পুণ্যি নিয়ে হলেও আমায় একটিবার আমার ভালোবাসার মানুষের দেখা পাইয়ে দাও।”
বিদেশে বিভুঁইয়ে নূর সাহেবের মনেও অস্থিরতা। অঢেল প্রাচুর্যের মাঝেও তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে। সে ভাবে, “কত নামী-দামী শিক্ষিত মেয়ে দেখলাম, কিন্তু অজপাড়াগাঁয়ের সেই পারুর জন্য কেন মনটা এভাবে কাঁদে? কেন তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবাই যায় না?” নূর সাহেবের মা যখন বিয়ের কথা তোলেন, সে সোজাসুজি মানা করে দেয়। বলে, “মা, তুমি তো আমার সব জানো। আমার পক্ষে আর কাউকে জীবনসঙ্গিনী করা সম্ভব নয়। এ জীবনে আমি আর কাউকে জড়াব না।”
একদিকে সমাজের কুসংস্কার, অন্যদিকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-পারু আর নূরের এই বিরহগাথা কোন দিকে মোড় নেবে?
সমাজের কুসংস্কার ও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস জানতে চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে শুধুমাত্র একুশে চেতনায়…