নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
দেশের বাজারে যখন নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে, তখন অবিশ্বাস্য কম দামে ফল ও সবজি আমদানির চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। পুরান ঢাকার ‘গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে মাত্র ২৮ থেকে ৩৩ টাকা কেজি দরে কাঁচামরিচ ও আপেল আমদানি করেছে বলে নথিপত্রে উল্লেখ করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এটি আসলে কোনো ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ বা পণ্যের প্রকৃত দাম গোপন করে বড় ধরনের অর্থ পাচারের একটি কৌশল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে ১২৫ কোটির অনিয়ম
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, গত তিন বছরে গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ মোট ২৩১টি লেটার অব ক্রেডিট (এলসি)-এর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৫ কোটি টাকা) মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে এই বিশাল অঙ্কের এলসি খোলা হয়।
কাগজ কলমে সস্তা, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র
তদন্তে দেখা যায়, আমদানিকৃত আপেল, টমেটো ও কাঁচামরিচের প্রতি কেজির দাম দেখানো হয়েছে মাত্র ২৩ থেকে ২৭ সেন্ট, যা বাংলাদেশি টাকায় ২৮ থেকে ৩৩ টাকার সমান। অথচ ওই সময়ে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের দাম ছিল কয়েকগুণ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সন্দেহ, পণ্যের দাম অস্বাভাবিক কম দেখিয়ে বাকি অর্থ অবৈধ পথে (হুন্ডি বা অন্য মাধ্যমে) বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
অস্তিত্বহীন সাপ্লাই চেইন ও সন্দেহজনক রফতানিকারক
অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। ভারত থেকে যে ‘সুরাইয়া এন্টারপ্রাইজ’ নামক প্রতিষ্ঠানটি এসব ফল ও সবজি রফতানি করেছে বলে দেখানো হয়েছে, তারা মূলত পোশাক ও গহনা ব্যবসার সাথে জড়িত। ফল বা কাঁচামাল সরবরাহের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ব্যবসার ধরন তাদের নেই। ফলে এই আমদানির সত্যতা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্তের দাবি বনাম তদন্তের অগ্রগতি
অভিযোগের বিষয়ে গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক মজিবুর রহমান জানান, তার সব লেনদেন বৈধ এবং যথাযথ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। পরিবহন ও শুল্ক মিলিয়েই তিনি পণ্য বিক্রি করেছেন এবং কোনো হুন্ডি লেনদেনের সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেন।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থ পাচারের শক্তিশালী ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিষয়টি এখন অধিকতর তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও রাজস্ব বিভাগের নজরে আনা হয়েছে।