শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ন
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
শিরোনাম :
হরমুজ সংকট: বিশ্ব অর্থনীতি ‘শ্বাসরুদ্ধ’ হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি মন্দার হুঁশিয়ারি গুতেরেসের ডিএসসিসি’র পশুর হাটের দরপত্র উন্মুক্ত: ৮ হাটে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি ডাক তৃণমূলের প্রতিভা অন্বেষণে বান্দরবানে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর প্রস্তুতি তুঙ্গে ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন সিটি’ করতে প্রধানমন্ত্রীর ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা আধার চিরে ঝুম বৃষ্টি: স্বস্তির সকালে রাজধানীতে চরম ভোগান্তি ৩৩ টাকায় আপেল, ২৮ টাকায় মরিচ: ‘আমদানি’র আড়ালে বিপুল অর্থ পাচারের সন্দেহ অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদে হার্ডলাইনে ডিএসসিসি: রিকশা মালিকদের সহায়তার আহ্বান মেঘালয়ে বাঁধের মহোৎসব: বিপন্ন সুরমা অববাহিকা, বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘মরণফাঁদ’ মালু পাড়ার মেয়ে পারু; পঞ্চম পর্ব সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব: সংসদে আইনমন্ত্রীর ঘোষণা

মেঘালয়ে বাঁধের মহোৎসব: বিপন্ন সুরমা অববাহিকা, বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘মরণফাঁদ’

Coder Boss
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১২ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বিশেষ প্রতিনিধি ॥
গুগল ম্যাপে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দিকে তাকালে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়ের যে গাঢ় সবুজ বনাঞ্চল চোখে পড়ে, তা আজ এক অশনিসংকেতের নামান্তর। পৃথিবীর অন্যতম আর্দ্র অঞ্চল চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামের বুক চিরে বয়ে আসা মিন্তদু ও কিনশি নদ- যা বাংলাদেশে সারি গোয়াইন ও যাদুকাটা নামে পরিচিত- এখন ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আগ্রাসনের মুখে। মেঘালয় সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দুই নদের ওপর অন্তত সাতটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের তোড়জোড় চলছে, যা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ও জনজীবনের জন্য এক ভয়াবহ ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

উজানে বাঁধের খেলা: মিন্তদু নদের সংকট
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রে ছিল তিস্তা। কিন্তু এখন নিঃশব্দে মেঘালয় সীমান্তে পানি আগ্রাসনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ২০১২ সালে ভারত মিন্তদু নদের ওপর ১২৬ মেগাওয়াটের ‘মিন্তদু লেশকা স্টেজ-১’ প্রকল্প চালু করে। ‘রান অব দ্য রিভার’ বা প্রবহমান স্রোতনির্ভর প্রকল্পের দোহাই দিয়ে তখন কোনো বড় জলাধার তৈরি না করার কথা বলা হলেও বর্তমানে চিত্র ভিন্ন।

মেঘালয় সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২১০ মেগাওয়াটের ‘মিন্তদু লেশকা স্টেজ-২’ প্রকল্পের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, এর বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) প্রস্তুত এবং কেন্দ্রীয় অর্থায়নও নিশ্চিতের পথে। শুধু তাই নয়, এর উজানে ১৭০ মেগাওয়াটের ‘সেলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’ নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে। ৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল দিয়ে নদীর পানি সরিয়ে নেওয়ার এই কর্মযজ্ঞ নদীটিকে কার্যত খণ্ডিত করে ফেলবে।

সাত বাঁধের বেড়াজালে সুরমা অববাহিকা
মেঘালয়ের ২০২৪ সালের নতুন বিদ্যুৎ নীতি অনুযায়ী, কেবল মিন্তদু নয়, কিনশি নদের ওপরও একের পর এক বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২৭০ মেগাওয়াটের ‘কিনশি স্টেজ-১’ এবং ২৭৮ মেগাওয়াটের ‘কিনশি স্টেজ-২’ প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুনে নতুন সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া এর শাখা নদীগুলোতে ‘উমনগি’ ও ‘ওয়াহব্লেই’ নামে আরও তিনটি প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প দূরত্বের ব্যবধানে যখন কোনো নদীতে সারিবদ্ধ একাধিক বাঁধ দেওয়া হয়, তখন আদি নদীখাতের স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বর্ষার প্রবল ঢল আর শুষ্ক মৌসুমে পানির হাহাকার- এই দুই চরম সংকটে নিক্ষিপ্ত হবে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল।

বাংলাদেশে যে প্রভাব পড়বে
মিন্তদু নদ সিলেট জেলার জৈন্তাপুর দিয়ে এবং কিনশি নদ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মেঘনা অববাহিকার সুরমা নদীতে মিশেছে। উজানে একের পর এক বাঁধের কারণে:

পরিবেশ বিপর্যয়: মিন্তদু নদের পানি অ্যাসিডিক হওয়ার কারণে এমনিতেই মাছ কমেছে। নতুন বাঁধের ফলে ইলিশসহ পরিযায়ী মাছের বংশবৃদ্ধি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

আকস্মিক বন্যা: ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে মেঘালয় বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, স্টেজ-১ প্রকল্পে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় প্রবল বৃষ্টিতে কয়েক মিনিটের মধ্যে বাঁধ উপচে ঢল নামতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের ভাটি এলাকায় ভয়াবহ ‘হড়কা বান’ বা আকস্মিক পাহাড়ি বন্যা দেখা দেবে।

কৃষি ও জীবিকা: বাঁধের কারণে নদ শুকিয়ে গেলে স্থানীয় কৃষিকাজ ব্যাহত হবে এবং যারা বালু-পাথর উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল, তারা চিরতরে জীবিকা হারাবেন।

তথ্য গোপনীয়তা ও অনিশ্চয়তা
ভারতের দাবি অনুযায়ী এসব প্রকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। মেঘালয় ও বাংলাদেশের উত্তরাংশের আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ ভারী বৃষ্টির প্রবণতা চারগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করে, তবে বাংলাদেশের পক্ষে এই বিপদের মাত্রা নির্ণয় করা অসম্ভব।

টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প জনরোষের মুখে স্থগিত হলেও মেঘালয়ের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাতটি প্রকল্পের ‘যৌথ ধ্বংসাত্মক রূপ’ টিপাইমুখের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুরমা-মেঘনা অববাহিকা রক্ষায় এখন এই তথাকথিত ‘পরিবেশবান্ধব’ প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও দ্বিপক্ষীয় জোরালো আলোচনার দাবি উঠেছে।

সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট (স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ অবলম্বনে)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2024 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102