মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ন
১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
শিরোনাম :
রাজধানীর আইসিসিবিতে ৭ মে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক কৃষি ও খাদ্য প্রদর্শনী হাতের মুঠোয় অবৈধ অস্ত্র: খুচরা দরে মিলছে পিস্তল-পেনগান, আতঙ্কে জনপদ মামলাজট কমাতে বড় ভরসা লিগ্যাল এইড: আইনমন্ত্রী রাজধানীর গলার কাঁটা অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা: ভেঙে পড়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিজের জমিতে দোকান করতে দিয়ে উল্টো অভিযোগে ও বিপাকে বিএনপি নেতা চাপের মুখে নতিস্বীকার: ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাইজমানি আরও বাড়াচ্ছে ফিফা ৫ জেলায় কালবৈশাখীর লাল সতর্কতা: ৬০-৮০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা তাপপ্রবাহের মধ্যেই দুই বিভাগে ঝড়ের পূর্বাভাস, ১ নম্বর সতর্ক সংকেত গডফাদাররা অধরা, তবুও মাদকজালে বন্দি দেশ: গোয়েন্দা তালিকায় ২০ হাজার কারবারি ভাগ্যলিপি: কেমন কাটবে আজকের দিন?

হাতের মুঠোয় অবৈধ অস্ত্র: খুচরা দরে মিলছে পিস্তল-পেনগান, আতঙ্কে জনপদ

Coder Boss
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, ক্রাইম ডেস্ক ॥
রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশন। হোয়াটসঅ্যাপে আসা প্রি-অর্ডারের বিদেশি পিস্তল ডেলিভারি দিতে এসেছিলেন সোহেল রানা ও হানিফ। ৭.০৫ এমএম মডেলের চকচকে সেই অস্ত্রটির দাম চূড়ান্ত হয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। একজন টাকা বুঝে নিচ্ছিলেন, অন্যজন দিচ্ছিলেন ডেলিভারি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; ডিবি পুলিশের জালে ধরা পড়েন এই দুই অস্ত্র কারবারি। গত ১১ এপ্রিলের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তার নয়, বরং দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্র কেনাবেচার এক ভয়ংকর ও সহজলভ্য চিত্র উন্মোচিত করেছে।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা এসব অস্ত্র ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। সোহেল ও হানিফ মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় অস্ত্রটি কিনে ৩০ হাজার টাকা লাভে বিক্রি করতে এসেছিলেন।

পেনগান ও ভাড়ায় মিলছে অস্ত্র
রাজধানীর অপরাধ জগতে নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে কলমের মতো দেখতে ‘পেনগান’। গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকায় এক যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ এই ক্ষুদ্রাস্ত্রের সন্ধান পায়। পেশাদার কিলার কাল্লু এটি মাত্র ৮০ হাজার টাকায় কিনে ব্যবহার করছিলেন। ডিবির তদন্ত বলছে, এই পেনগানটি হাতবদল হয়েছে চারবার। শুরুতে এর দাম দেড় লাখ টাকা থাকলেও সর্বশেষ ধাপে এটি ৮০ হাজারে বিক্রি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, এই চক্রের মূল হোতারা ধরা না পড়ায় আরও অনেকের হাতেই রয়েছে এমন অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র।

অন্যদিকে, গত শনিবার আগারগাঁও থেকে বিদেশি পিস্তলসহ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা জানায়, ২ লাখ টাকায় কেনা অস্ত্রটি তারা অনুসারীদের কাছে মাত্র ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া দিতেন। ঝুঁকি বুঝে ভাড়ার অংক নির্ধারণ করা হতো। মাদক ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এসব অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার চলছে। বর্তমানে ভালো মানের একটি ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

রেডজোনে ৮ এলাকা, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, গত তিন মাসে রাজধানীতে ৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৫টিই বিদেশি পিস্তল। মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে রাজধানীর ৮টি থানাকে ‘রেডজোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এলাকাগুলো হলো: পল্লবী (সর্বোচ্চ ৬টি মামলা), মোহাম্মদপুর, উত্তরা পূর্ব, ওয়ারী, কাফরুল, গেন্ডারিয়া, তুরাগ ও যাত্রাবাড়ী। টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েছে।

রুটে পরিবর্তন ও চড়া দাম
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় এর দামও বেড়েছে ৩ থেকে ৪ গুণ। আগে যা ৩০-৪০ হাজারে মিলত, এখন তা এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক নেতা ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই এর মূল ক্রেতা।

ব্যবসায়ীরাও তাদের কৌশল পাল্টেছেন। আগে বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুটটি জনপ্রিয় থাকলেও এখন ধরা পড়ার ভয়ে বেনাপোল থেকে খুলনা হয়ে অস্ত্র ঢাকায় আনা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারাদেশে অস্ত্র আইনে ৫৯৭টি মামলা হয়েছে। বিজিবি ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে। যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্ত রুটগুলো দিয়ে এখনো ঢুকছে অবৈধ মারণাস্ত্র।

ঝুঁকির মুখে নিরাপত্তা
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুণ্ঠিত ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি, যা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র দাগি আসামি ও উগ্রবাদীদের হাতে রয়েছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগে দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র ঢুকেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে এর চাহিদা বেড়েছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে এর চালান ঠেকানো না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।”

প্রশাসনের বক্তব্য
ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন এবং নজরদারি বাড়িয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। শুটারদের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের মাধ্যমে মূল হোতাদের ধরা সম্ভব হবে।”

তবে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা জানাচ্ছেন, অবৈধ অস্ত্রের কোনো হালনাগাদ তালিকা না থাকায় কাটআউট পদ্ধতিতে সরবরাহ করা এসব কারবারিদের ধরতে তাদের বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2024 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102