নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ডেস্ক ॥
সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি আর নিয়মিত অভিযানের মাঝেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে মাদকের মরণনেশা। শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্রই এখন মাদকের অবাধ ছড়াছড়ি। সীমান্ত গলে আসছে একের পর এক চালান। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ দেশের সবকটি নিরাপত্তা বাহিনী তৎপর থাকলেও মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা বা ‘গডফাদাররা’ থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেশজুড়ে ২০ হাজার ৮৯১ জন মাদক কারবারির বিশদ তথ্য মিলেছে।
তালিকায় হাজারো গডফাদার
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাদকের বিস্তারে তিন স্তরের সিন্ডিকেট কাজ করছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬২০ জন গডফাদার, ৬ হাজার ২২৭ জন পাইকারি বিক্রেতা এবং ১৩ হাজার ৪৪ জন খুচরা কারবারি সক্রিয়। এই গডফাদাররাই মূলত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে মাদকের বড় বড় চালান দেশে ঢোকানোর মূল কারিগর।
সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়:
পুলিশের তালিকায়: ১৯ হাজার ৪৫ জন কারবারি।
বিজিবির তালিকায়: ৩ হাজার ৯৬৪ জন।
র্যাবের তালিকায়: ৩ হাজার ৭৬ জন (সর্বোচ্চ র্যাব-২ এলাকায় ৫৬৫ জন)।
গডফাদারদের আঞ্চলিক পরিসংখ্যান
মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। গডফাদার এবং কারবারির সংখ্যায় সব বিভাগকে ছাড়িয়ে গেছে এই অঞ্চল।
| বিভাগ | গডফাদার সংখ্যা | পাইকারি বিক্রেতা | খুচরা বিক্রেতা |
| চট্টগ্রাম | ৩০৯ | ১,৪২৭ | ২,৮২৮ |
| রাজশাহী | ২৭৩ | ১,২৩৭ | ২,৫৩৯ |
| রংপুর | ২৩৭ | ৬৬৬ | ৯৫৪ |
| ঢাকা | ২৩১ | ১,১০২ | ২,৪৮৯ |
| খুলনা | ২২৮ | ৬৩৪ | ১,৯৮২ |
| বরিশাল | ১১৭ | ৩২০ | ৬২১ |
| ময়মনসিংহ | ১১৫ | ৪৮১ | ৯৮৩ |
| সিলেট | ১১০ | ৩৬০ | ৬৪৮ |
বিশেষ নজরদারিতে টেকনাফ ও সীমান্ত এলাকা
প্রতিবেদনে কক্সবাজারের টেকনাফকে মাদক কারবারের ‘বিশেষ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে জনপ্রতিনিধি ও তাদের স্বজনদের নামও উঠে এসেছে। হোয়াইক্যংয়ের বার্মাইয়া নুর, জাহেদ হোসেন, টেকনাফ সদরের হারুন অর রশিদসহ দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে প্রভাবশালী অনেকের নাম। একইভাবে কুমিল্লা সীমান্তে গাঁজা ও ফেনসিডিল পাচারের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে আশিক ওরফে বোমা আশিক, আবুল কাশেমদের মতো কয়েক ডজন কারবারি। রাজশাহী ও সিলেটেও অর্ধশতাধিক গডফাদারের নাম জমা পড়েছে মন্ত্রণালয়ে।
বাহিনীর ভাষ্য ও সীমাবদ্ধতা
বিজিবি জানিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিয়মিত চালান জব্দ করছে। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৯২২ জন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বিজিবি কর্মকর্তাদের মতে, এটি একটি বহুমাত্রিক অপরাধ চক্র যার শেকড় সীমান্তের ওপারেও বিস্তৃত।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন। সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন জানান, তারা নিয়মিত অভিযান চালালেও গডফাদারদের বিরুদ্ধে অকাট্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, “অনেকে স্থানীয়ভাবে গডফাদার হিসেবে পরিচিত হলেও তাদের কাছে সরাসরি মাদক পাওয়া যায় না। তবে অস্বাভাবিক লেনদেন ও মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ পেলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় নাম থাকলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অদৃশ্য প্রভাবে বড় কারবারিরা ধরা পড়ে না। মাঠ পর্যায়ে শুধু ‘বাহক’ গ্রেপ্তার হওয়ায় মাদকের মূল উৎস বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু তালিকা নয়, গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলেই এ মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।