নিজস্ব প্রতিবেদক ও স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা ডেস্ক ॥
রাজধানীর রাজপথ থেকে অলিগলি- সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জয়জয়কার। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে চলা এসব যান এখন নগরবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, তীব্র যানজট আর বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে জনজীবন ওষ্ঠাগত। ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন না করলে অটোরিকশার এই দৌরাত্ম্য থামানো অসম্ভব।
সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও বিশৃঙ্খলা
সরেজমিনে আফতাবনগর, গুলশান ও বাড্ডা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অটোরিকশাগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল তো মানছেই না, বরং বীরদর্পে উল্টো পথে চলাচল করছে। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে হঠাৎ যাত্রী ওঠানামা করায় তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। গত ১৭ এপ্রিল শ্যামপুর এলাকায় ওড়না পেঁচিয়ে পিংকি খাতুন নামে এক নারীর মৃত্যু অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের ভয়াবহতাকে আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে।

মোটরবাইক চালক জুয়েল রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এসব চালকের না আছে লাইসেন্স, না আছে গাড়ির নম্বর। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলে এই গলার কাঁটা দূর হবে না।” একই শঙ্কার কথা জানালেন ব্যাংক কর্মকর্তা রাফায়েল হাসান। সম্প্রতি দুর্ঘটনায় আহত এই পথচারী বলেন, রাস্তা পার হতে এখন ভয় লাগে, কখন কোন দিক থেকে বেপরোয়া অটো এসে ধাক্কা দেয় তার ঠিক নেই।
ঝুলে আছে বুয়েটের উন্নত মডেল
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুয়েট কর্তৃক অনুমোদিত নিরাপদ অটোরিকশার একটি মডেল দক্ষিণ সিটির জিগাতলা এবং উত্তর সিটির আফতাবনগরে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে চালু হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্টের আদেশের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে প্রকল্পটি বর্তমানে থমকে আছে। ফলে গ্যারেজে তৈরি ব্রেকিং সিস্টেমহীন নিম্নমানের রিকশার সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।
তোশি মোটর ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও লোকমান শাহ জানান, বর্তমানে রাস্তায় চলা অধিকাংশ অটোরিকশা অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। তিনি বলেন, “বুয়েট অনুমোদিত আমাদের মডেলে নিরাপত্তা ও ইন্স্যুরেন্স নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করলে সরকার যেমন রাজস্ব পাবে, তেমনি সড়কও নিরাপদ হবে।”
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও নীতিমালার দাবি
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের হাতে এখন অটোরিকশার স্টিয়ারিং। আমদানিকারক ও চালক- সবার সাথে আলোচনা করে একটি কল্যাণমুখী পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা এখন সময়ের দাবি।”
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, “সড়কের ধারণক্ষমতার চেয়ে অটোরিকশা বেশি হয়ে গেছে। দ্রুত রুট নির্ধারণ, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা জরুরি।”
সরকারের পরিকল্পনা
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ঢাকার যানবাহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধান সড়কগুলোতে পর্যায়ক্রমে অটোরিকশা প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “আমরা সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি সমন্বিত সমাধানের চেষ্টা করছি যাতে যানজট ও বিশৃঙ্খলা দূর করা যায়।”
রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, কেবল আশ্বাস নয়, কঠোর আইন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুতই নিরাপদ হবে ঢাকার সড়ক।