আদালত প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক ॥
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং ওই কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের কঠোর সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলা যায় না, বরং এটি ছিল একটি ‘সিলেক্টিভ প্রসেস’। এমনকি গণভোটে ভোটাররা ঠিক কী উদ্দেশ্যে ভোট দিচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তাদের স্বচ্ছ ধারণা ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জন-আকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। উল্লেখ্য, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নিজেই উক্ত ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলেন।
‘গণতন্ত্র কোথায় ছিল?’
বৈঠকে জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যের ভিন্নমত পোষণ করে সারা হোসেন বলেন, “আপনারা বলছেন এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে, কিন্তু এই ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বলা যায় না। কয়েকজন মিলে বসে আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে বাইরের কেউ কথা বলতে পারেনি। সংস্কার কমিশনে একজন নারীও ছিলেন না, অথচ পুরো বিচারব্যবস্থা ও বিচারপ্রার্থীদের একটি বড় অংশই নারী। এই প্রক্রিয়ায় অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের স্বীকার করতে হবে।”
গণভোট নিয়ে প্রশ্ন
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের তৃতীয় প্রশ্নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “ভোটে ৩০টি প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। উপস্থিত কেউ কি হাত তুলে বলতে পারবেন সেই ৩০টি প্রস্তাব আসলে কী ছিল? ভোটাররা কিসের জন্য ভোট দিয়েছেন, তা তারা নিজেরাও জানেন না। শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার মূল্য কতটুকু থাকে?”
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নতুন আইন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের হাতিয়ার হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। আগে একজন বিচারপতির একটি পেনড্রাইভ কিনতেও নির্বাহী অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আর্থিক ও প্রশাসনিক পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকা আবশ্যক।
সাবেক প্রধান বিচারপতিদের প্রসঙ্গে ক্ষোভ
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, “তাকে সম্ভবত গোয়েন্দা সংস্থার চাপেই দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এত বছর পার হলেও নাগরিক সমাজ এটি নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। কেন তাকে যেতে হলো, তা পরিষ্কার হওয়া উচিত।”
একইভাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “খায়রুল হক বিতর্কিত রায় দিলেও তিনি এখন জেলখানায় আছেন জুলাইয়ের হত্যা মামলায়। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে গুলি চালাননি বা নির্দেশও দেননি, অথচ তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে নাগরিক সমাজ কেন চুপ?”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের চাপে দক্ষ বিচারকদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করা বা বসিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকেও বের হয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী ও ফাহিম মাশরুর। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।