নিজস্ব প্রতিবেদক ও ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি, অনলাইন ডেস্ক ॥
দেশে জ্বালানিসংকট ও লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পোলট্রি ও মৎস্য খাতে। খামার পরিচালনা, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ থেকে পরিবহন- প্রতিটি স্তরে জ্বালানি নির্ভরতা থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি লাফিয়ে বাড়ছে খরচ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
খামার পরিচালনায় ব্যয় বৃদ্ধি ও মৃত্যুঝুঁকি
পোলট্রি খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আলো ও পানি সরবরাহের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে খামারিরা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
গাজীপুরের খামারি শফিকুল ইসলাম জানান, আগে প্রতি ব্যাচ মুরগিতে যেখানে ২ লাখ টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজারে। অন্যদিকে, ধামরাইয়ের খামারি নুজরুল ইসলাম জানান, জ্বালানি সংকটে জেনারেটর চালাতে না পারায় পানি সংকটে তার খামারের ১১৫টি মুরগি মারা গেছে। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকায় বাড়ছে ‘হিট স্ট্রোকের’ ঝুঁকিও।
ফিড উৎপাদন ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতা
পোলট্রি ও মাছের খাদ্য (ফিড) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে ধুঁকছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জানান, জেনারেটর চালানোর জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ৩-৪ মাসের। বাকি অংশ আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভ্যাকসিন আমদানিতে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে।
স্থবিরতা মৎস্য বন্দরে
সাগরগামী মাছ ধরার ট্রলারগুলো সম্পূর্ণ ডিজেলনির্ভর। পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের জেলেরা জানান, একটি ট্রলারে ৫ থেকে ৬ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। ডিজেল সংকটে জেলেরা গভীর সমুদ্রে যেতে পারছেন না, ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মৎস্য বন্দরে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সাপ্লাই চেইন ও পরিবহন ব্যয়
পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। শফিকুল ইসলামের তথ্যমতে:
আগে যে ট্রাক ভাড়া ছিল ১৩ হাজার টাকা, তা এখন ২০ হাজার টাকা।
দূরপাল্লায় পরিবহন খরচ বেড়েছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ।
অনিশ্চয়তার কারণে অনেক চালক দূরপথে যেতে অনাগ্রহী, যা পুরো সাপ্লাই চেইনকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের পরামর্শ
সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে খামার চালানো বর্তমানে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তিনি খামারিদের প্রাকৃতিক উপায়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পোলট্রি ও মাছ সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস। এই খাতের অস্থিরতা নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করবে। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান না হলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।