নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় পুলিশের সাবেক দুই সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মামলার বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছেন আদালত।
দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিচয়
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন- পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। রায়ের সময় তারা দুজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মামলার মোট ৩০ আসামির মধ্যে ৩ জনকে যাবজ্জীবন ও বাকিদের অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল ২০২৬) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আসামি ও গ্রেপ্তারের চিত্র
মামলায় অভিযুক্ত ৩০ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন:
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম।
সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল।
রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ।
সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
পলাতক আসামিদের তালিকা
সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ ২৪ জন আসামি এখনো পলাতক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন: শিক্ষক মশিউর রহমান, আসাদুজ্জামান মন্ডল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী হাফিজুর রহমান, মনিরুজ্জামান পলাশসহ অনেকে।
পুলিশ কর্মকর্তা: রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান, সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন ৬ কর্মকর্তা।
ছাত্রলীগ নেতা: বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমানসহ ৮ জন।
প্রেক্ষাপট: বীরত্বের সেই ১৬ জুলাই
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দিয়ে অকুতোভয় বীরত্ব প্রদর্শন করেন আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে ছোড়া গুলিতে তার মৃত্যু হয়। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া
গত বছরের ২৪ জুন ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এরপর ৬ আগস্ট অভিযোগ গঠন এবং ২৭ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। আজ (০৯ এপ্রিল ২০২৬) সেই কাঙ্ক্ষিত রায়ের মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলো।