বিশেষ প্রতিনিধি, ডেস্ক রিপোর্ট ॥
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। মুক্ত চিন্তা ও সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা ছাড়া গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ অসম্ভব। ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, স্বৈরাচারী বা অবৈধ দখলদাররা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে প্রথমেই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের প্রবাহ কেবল মূলধারার সংবাদপত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; সোশ্যাল মিডিয়া এখন জনমতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে যেসব দেশে গণতন্ত্র দুর্বল বা সেন্সরশিপ প্রবল, সেখানে ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিকল্প কণ্ঠস্বর হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। আরব বসন্ত থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব-সবক্ষেত্রেই এই সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
সত্যের অপমৃত্যু ও ‘ডিজিটাল মিসাইল’
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত ভয়াবহ। সামাজিক দায়বদ্ধতাহীন এই মাধ্যমগুলো এখন ‘ভিউ’ আর ‘ভাইরাল’ ব্যবসার ফাঁদে বন্দি। যাচাই-বাছাই ছাড়াই চটকদার মিথ্যা আর গুজব ছড়িয়ে উপার্জনের নেশায় মেতেছে একদল ভিউ ব্যবসায়ী। সত্য আজ তাদের কাছে জিম্মি। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে চারিত্রিক হরণ ও কুৎসিত অপপ্রচারের ‘ডিজিটাল মিসাইল’। তথাকথিত অনেক ইউটিউবার নিজের ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে নিরীহ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে, যা সমাজে এক নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুস্থ রাজনীতির অন্তরায়
রাজনীতি একটি জাতির বিবেক হলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তির জায়গা নিয়েছে গালিগালাজ, আর মতের জায়গায় ঠাঁই পেয়েছে চরম বিদ্বেষ। ভিন্নমত পোষণ করলেই মিলছে ‘দালাল’, ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘গুপ্তচর’ তকমা। বিশেষ করে নারী রাজনীতিকদের প্রতি ছড়ানো হচ্ছে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। এই অসুস্থ চর্চা আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে সহিংস করে তুলছে। এখানে নিরপেক্ষ থাকা মানে ‘সুবিধাবাদী’ আর নীরব থাকা মানে ‘ভীতু’ হিসেবে গণ্য হওয়া-যা একটি বিষাক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।
এআই ও ডিসইনফরমেশনের মরণফাঁদ
উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষের ছদ্মবেশে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এই ‘ডিসইনফরমেশন’ বা ভুল তথ্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ঘটাচ্ছে প্রাণঘাতী সহিংসতা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: ভারতে শিশু অপহরণের ভুয়া ভিডিওর জেরে পিটিয়ে হত্যা এবং ব্রাজিলে তুকতাকের গুজবে ফাবিয়ানে ডি জেসুসকে হত্যার ঘটনাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়াবহতার প্রমাণ।
দেশীয় প্রেক্ষাপট: ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলা, ২০১৯ সালে ভোলার সংঘর্ষ এবং ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মব জাস্টিসের নামে যে সম্পদহানি ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার মূলে ছিল সামাজিক মাধ্যমের উস্কানি।
চাঁদাবাজি ও ‘হানি ট্র্যাপ’
সোশ্যাল মিডিয়াকে ঢাল বানিয়ে বর্তমানে রমরমা চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেলিং চলছে। প্রভাবশালী বা সাধারণ মানুষের ছবি বিকৃত করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রলোভনমূলক ফাঁদ পেতে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে চরিত্রহননের নোংরা খেলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। এমনকি আদালতের বিচারের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তথাকথিত ‘তালিকা’ প্রকাশ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের বিচারিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
উত্তরণের পথ
অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই গণতন্ত্রকে গুটি কয়েক ভিউ ব্যবসায়ীর হাতে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। এই নৈরাজ্য বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি:
ডিজিটাল সাক্ষরতা: নাগরিকদের গুজব চেনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তি কোম্পানির দায়বদ্ধতা: অ্যালগরিদম স্বচ্ছ করে ভুয়া তথ্যের বদলে সঠিক তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক ঐক্য: বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
যুগোপযোগী নীতিমালা: সরকারকে এমন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে, কিন্তু ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে।
সময় থাকতে এই ‘ভাইরাল কালচার’ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আমাদের গণতন্ত্র ও সামাজিক সম্প্রীতি চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।