নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেস্ক রিপোর্ট ॥
ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকটের ‘ত্রিমুখী চাপে’ অস্থির হয়ে উঠেছে রড ও সিমেন্ট খাত। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সাধারণ বাড়ি নির্মাণকারী থেকে শুরু করে আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাজারের বর্তমান চিত্র
রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের (গ্রেড-১) প্রতি টন রড বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৯৪ থেকে ৯৬ হাজার টাকায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৮৫ থেকে ৮৬ হাজার টাকা। কম পরিচিত ব্র্যান্ডের রড, যা আগে ৮১-৮৩ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা।
সিমেন্টের বাজারেও একই অস্থিরতা। দুই সপ্তাহ আগে যে সিমেন্ট ৪৮০-৪৯০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৫১০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের মতে, কোম্পানিগুলো হঠাৎ করেই সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংকটের নেপথ্যে কারণ
উৎপাদনকারী ও খাত সংশ্লিষ্টরা এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন:
১. কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি: রড তৈরির প্রধান উপাদান ‘স্ক্র্যাপ’ এর দাম টনপ্রতি ৫০-৬০ ডলার এবং সিমেন্টের কাঁচামাল ‘ক্লিঙ্কার’ এর দাম টনপ্রতি ১০-১২ ডলার বেড়েছে।
২. জ্বালানি ও গ্যাস সংকট: দেশে গ্যাসের স্বল্পতায় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজেলের কৃত্রিম সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়া দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেড়ে গেছে।
৩. পরিবহন জটিলতা: জ্বালানি তেলের রেশনিংয়ের কারণে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন থাকায় সময়মতো পণ্য ডিলার পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ
বিএসএমএ-এর মহাসচিব ড. সুমন চৌধুরী বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া আরও বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে।” অন্যদিকে, ডায়মন্ড সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক জানান, আমদানিনির্ভর কাঁচামালগুলোর দাম ৮-১০ ডলার করে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ক্রেতা ও আবাসন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, বৈশ্বিক সংকটকে পুঁজি করে দেশীয় সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। রিহ্যাব-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, “এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে নির্মাণাধীন বহু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ফ্ল্যাটের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাবে। সরকারের উচিত দ্রুত তদারকি টিম গঠন করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা।”
নির্মাণ খাতে অশনিসংকেত
নির্মাণসামগ্রীর এমন লাগামহীন দামের কারণে শুধু ব্যক্তি উদ্যোগের বাড়ি নির্মাণই নয়, সরকারি বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় বা বিশেষ নজরদারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা