নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক ॥
ইরানের সাথে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের দামামা বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করলেও, ভৌগোলিক দূরত্ব ছাপিয়ে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের মুখে সরকার এখন নতুন করে বাজেট পরিকল্পনা সাজাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচিত নতুন সরকার যখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও উদার ব্যয়নীতির মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে সংকটে আমদানি ও বাজার
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও খাদ্যপণ্যের আমদানিতে বিঘ্ন ঘটতে শুরু করেছে। বাজারে এসব পণ্যের সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে দাম। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যান ঈদের পরপরই প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করবেন। এর আগে আর্থিক মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
উদার ব্যয়নীতি বনাম ব্যয়সংকোচন
গত বছরের নভেম্বর থেকে ব্যয়সংকোচন নীতি অনুসরণ করা হলেও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার চেয়েছিল এই নীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী একটি উদার বাজেট প্রণয়ন করতে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৪৮ হাজার থেকে ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। যেখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা ছিল। অথচ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঋণের বোঝা ও রাজস্ব ঘাটতি
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায়ের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আইএমএফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ বাংলাদেশকে ৩০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল ঋণের বোঝা ও রাজস্ব ঘাটতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষক ও সরকারের বক্তব্য
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি মনে করছে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন:
“বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়িয়ে দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে।”
আপাতত যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে আগামীর বাজেটের গতিপথ। জরুরি পণ্য হিসেবে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের মজুত বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।