লেখক: আসাম্বর ॥
নূর সাহেবের মায়ের মায়া ত্যাগ করে পারু কিছুতেই যেতে চাইছে না। অথচ পরিস্থিতির চাপে পারুর মা তাকে একপ্রকার জোর করেই বাড়ির পথে রওনা করালেন। বিদায়বেলায় নূর সাহেবের মা পারুর মায়ের হাতে কিছু নগদ অর্থ গুঁজে দিলেন; সাথে পারুর জন্য রঙিন শাড়ি ও নতুন পোশাকের প্যাকেট। ম্লান হেসে তিনি বললেন, “ভয় নেই, সাবধানে যাও।
ভবিষ্যতে কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমায় কিংবা আমার ছেলে নূরকে জানিও। আমরা মানুষকে আলাদা ধর্মের বা জাতের বলে মনে করি না। আমাদের কাছে মানুষই বড় পরিচয়। এই দুনিয়ায় জাত-পাত বা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ তো মানুষেরই সৃষ্টি। আসলে পার্থক্যটা মনের; যাদের মন সংকীর্ণ, সমাজে তারাই নিচু স্তরের মানুষ। আমরা বিত্ত নয়, চিত্তের সম্মান করি।”
নুর সাহেবের মায়ের মহানুভবতা পারুর দু-চোখ বেয়ে অশ্রুর ঝর্ণা বয়ে চলছে! ভারাক্রান্ত মন নিয়ে অল্পকিছু দুর যেতে না যেতেই আশেপাশে থেকে বেশ কিছু শিয়াল-শকুনসহ ডায়নাদের ভয়ংকর আক্রমণ শুরু করলো! পারুর মায়ের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে!
এই দিকে পারুর মা স্বজোরে চিৎকার করে বলছে কে কোথায় আছেন আমাদের রক্ষা করুন! কে যেন নুর সাহেবের মা কে খরব পৌঁছে দিতে গিয়েছে নুর সাহেবের মা কে বলছেন আপনার আশ্রয়ে থাকা পাগলী কে রাস্তায় কিছু লোক টানাটানি করছে! এ কথা শোনা মাত্রই সেখানে গিয়ে দেখেন কিছু শকুন ধারালো ঠোঁটের ছোবল দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে! নুর সাহেবের মায়ের এক ধমকে সবাই দৌড়ে পালিয়ে গেল!
অতঃপর তারা আবার রওনা হলো, পথ চলতে চলতে পারুর মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকেন, “ভগবানের অসীম কৃপায় আবার সংসারে ফিরছিস মা। স্বামীই তো দেবতা, কালুরামের সেবা-যত্ন করিস। দেখবি, তোর ফেরার খবর শুনে সে কত খুশি হবে। নির্ঘাত নতুন শাঁখা-সিঁদুর নিয়ে তোর পথ চেয়ে বসে আছে।” মায়ের কথাগুলো পারুর কানে যেন ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছিল না।
তার মাথা ঘুরছে, শরীরের ভেতরে এক অসহ্য অস্বস্তি। আচমকা সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “মা, আমি আর পারছি না। চারপাশটা কেমন অন্ধকার লাগছে।” কথা শেষ হতে না হতেই সে বমি করতে শুরু করল।
অত্যন্ত করুণ অবস্থায় যখন তারা বাড়ি পৌঁছাল, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পারু যেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। মেয়ের এই শোচনীয় দশা দেখে পারুর বাবা ফেটে পড়লেন রাগে। স্ত্রীকে লক্ষ্য করে তিনি অকথ্য ভাষায় তিরস্কার শুরু করলেন, “তোর লোভের জন্য আজ মেয়ের এই দশা! ধর্মের দোহাই দিয়ে ভ্রান্ত পথে চালিত করে আজ মেয়েটার জীবনটা শেষ করে দিলি!” পারুর মা আজ কোনো প্রতিবাদ করলেন না; অপরাধবোধে মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
পরদিন সকালে পারুর বাবা তাকে নিয়ে গঞ্জের ডাক্তার শনি রায়ের চেম্বারে গেলেন। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে জানালেন, “অভিনন্দন বাবু, আপনার মেয়ে মা হতে চলেছেন। সে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।”
খবরটা শুনে পারুর বাবার মনে যেন আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সু-নজর অবশেষে তার পরিবারের ওপর পড়েছে। বাড়ি ফিরতেই পারুর মা উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইলেন, “ডাক্তারবাবু কী বললেন? কিসের ওষুধ দিলেন?” বাবা যখন সগৌরবে সংবাদটি দিলেন, তখন পারুর মায়ের আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ল।
তিনি হতভম্ব হয়ে ঘরের কোণে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মনে মনে বললেন, “হে ভগবান, এ কোন পরীক্ষায় ফেললে আমায়? এই পাপের মুখ আমরা সমাজে কোথায় লুকাবো?” তিনি বুঝতে পারলেন, এই সন্তান কালুরামের নয়। কিন্তু স্বামীর কাছে এই সত্য প্রকাশ করার সাহস তার হলো না।
এদিকে পারুর ফিরে আসার খবর পেয়ে স্বামী কালুরাম জলদাস মহা আনন্দে দই-মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি হাজির হলো। কিন্তু পারু তার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। পারুর মা মনে মনে পরিকল্পনা করলেন, যেভাবেই হোক কালুরামের সাথে মেয়েকে পাঠিয়ে দিতে পারলেই রক্ষা। কিন্তু পারুর শরীর এতটাই ভেঙে পড়েছে যে কালুরাম নিজেই আফসোস করে বলল, “এখন বরং থাক, শরীরটা একটু সারুক। অন্য একদিন এসে নিয়ে যাবো।”
দিন যত গড়ায়, পারুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ততই অবনতি হতে থাকে। আর লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে নানা কানাঘুষা। বাতাসের আগে রটে যায় নিষিদ্ধ কু-কথা। কয়েকদিনের মধ্যেই পারুর শ্বশুরবাড়ি থেকে শশুরের নেতৃত্বে বিশ-পঁচিশ জন মাতব্বর এসে সালিশ বসালেন। তাদের সাফ কথা, “মেয়ে ছয় মাস নিখোঁজ ছিল, অথচ এখন সে তিন মাসের পোয়াতি! এটা কী করে সম্ভব? এই কলঙ্ক আমরা নেব না।”
গ্রামের মাতব্বরেরা টাকার বিনিময়ে কালুরামের পরিবারের পক্ষ নিলেন। নামমাত্র কিছু অর্থের বিনিময়ে নিমেষেই চুকে গেল সব হিসাব। ভেঙে গেল পারু আর কালুরামের সংসার। এখন প্রায়ই দেখা যায়, পারু উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে। এক বুক নীরব হাহাকার নিয়ে সে যেন বোবা চোখে মহাকালের বিচার চাইছে।
আরো জানতে চোখ রাখুন পরের পর্বে, শুধুমাত্র একুশে চেতনায়।