আন্তর্জাতিক ডেস্ক, অনলাইন সংস্করণ ॥
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের পর মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। তেহরানের পাল্টা আঘাতের পরিধি এবার কেবল ইসরায়েলের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা আছড়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতেও। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের পাশাপাশি ইরানের বিধ্বংসী আক্রমণের শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। রাজধানী আবুধাবিতে প্রাণহানির পাশাপাশি একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
নেপথ্যে কি আব্রাহাম অ্যাকর্ড ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্ন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই সরাসরি আক্রমণের মূলে রয়েছে ২০২০ সালের আলোচিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’। এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর থেকেই তেহরানের চক্ষুশূলে পরিণত হয় আবুধাবি। যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘকাল পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কিন্তু আমিরাত তা প্রকাশ্যে এনে এক প্রকার ‘আঞ্চলিক ফ্রন্ট’ গড়ে তুলেছে বলে মনে করে ইরান। বিশেষ করে ২০১৫ সালে আবুধাবিতে ইসরায়েলি কূটনৈতিক মিশন খোলার পর থেকেই দুই দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা কয়েক গুণ বেড়েছে।
বাণিজ্যিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের কাঁটা
বর্তমানে তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলো আরব আমিরাত। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। তবে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হলো দুই দেশের সামরিক জোট। যৌথ নৌ-মহড়া, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা এবং যৌথভাবে মারণাস্ত্র তৈরির মাধ্যমে আমিরাত নিজেকে ইসরায়েলের একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করছে—এমনটাই বিশ্বাস তেহরানের।
ইরানের কঠোর রাজনৈতিক বার্তা
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত। মূলত যেসব দেশ মার্কিন সামরিক অবকাঠামোকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের প্রতি একটি কঠোর হুঁশিয়ারি এটি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই বার্তাই দিতে চাইল যে—কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো সম্পর্কই সুরক্ষা দেবে না, যদি তারা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ফ্রন্ট তৈরি করতে সহায়তা করে।
টালমাটাল অর্থনীতি ও আকাশপথ
আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিল। তবে এই হামলার পর সেই ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
বিমান চলাচল: হামলার পর পরই দেশটির আকাশপথে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
অর্থনীতি: তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে এবং আঞ্চলিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এতদিন আমিরাত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী এবং অন্যদিকে ইরানের সাথে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার নীতিতে অটল ছিল। কিন্তু আবুধাবির মাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ সেই ভারসাম্যকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে কি না, সেই আশঙ্কাই এখন বিশ্বজুড়ে।