বিশেষ প্রতিনিধি, ডেস্ক রিপোর্ট ॥
ঢাকা: ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ কি আবার সেই পুরনো বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছে? পনেরো বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলেও, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে তাঁর অনুগতদের উপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে জনমনে দানা বাঁধছে তীব্র সংশয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দৃশ্যপট বদলালেও নেপথ্যের কুশীলবরা রয়ে গেছেন প্রায় অপরিবর্তিত, যাকে অনেকে অভিহিত করছেন ‘হাসিনা টু হাসিনা’ ট্রানজিশন হিসেবে।
পীর ও আত্মীয়তন্ত্রের ছায়া
বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলেও জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে। রাষ্ট্রপতি নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। জুলাইয়ের বিপ্লবীরা এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের দাবি জানালেও রহস্যজনক কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানে তারা বহাল থেকেছেন।
বিএনপির অবস্থান ও তারেক রহমানের কৌশল
আঠারো বছর নির্বাসনে থাকা বিএনপি নেতা তারেক রহমান দেশে ফেরার পর ক্ষমতার রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার অজুহাতে বিএনপি রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে অপসারণের দাবিতে সমর্থন দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, তারেক রহমান দ্রুত নির্বাচন ও নিজের দেশে ফেরার পথ সুগম করতেই এই ‘সাংবিধানিক ঢাল’ ব্যবহার করেছেন। ফলে শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত ব্যক্তিরাই এখন বর্তমান প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে গেছেন।
বিচারহীনতা ও আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান
তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সহস্রাধিক মামলা প্রত্যাহার এবং অনেক লীগ নেতাকে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পরিবর্তনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা অনেকের মতে তাঁকে ‘বেকসুর খালাস’ দেওয়ার একটি নীল নকশা। ‘আমার দেশ’ পত্রিকার এক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, আগামী ২৬ মার্চ শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
ক্ষমতার কামড়াকামড়ি ও জুলাইয়ের চেতনা
বর্তমানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য ‘সখ্য’ ও ‘দ্বন্দ্বের’ অদ্ভুত মিশেল দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রপতির প্রশংসা কুড়াচ্ছে বিএনপি, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে শুরু হয়েছে অন্য দলগুলোর ওপর হামলা। সম্প্রতি রুমিন ফারহানা ও হান্নান মাসুদের এলাকায় হামলার ঘটনা রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শেখ হাসিনা তাঁর অনুগতদের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ছক কষছেন। যদি বর্তমান সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের মর্যাদা না দিয়ে পুরনো প্রতিহিংসা ও আপসের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে তরুণ প্রজন্ম আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
“রাজনীতি যদি শুধু গদি দখলের বেহায়াপনা হয়, তবে হাজারো ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। চুপ্পু ও ওয়াকারের মতো ব্যক্তিরা যদি ‘হাসিনা টু হাসিনা’ সেতুর ভূমিকা পালন করেন, তবে অচিরেই বিপ্লবের চেতনা ধূলিসাৎ হবে।”
জুলাইয়ের চেতনা যদি পুনরায় জাগ্রত হয়, তবে আপসকামী কোনো শক্তিই পালানোর পথ পাবে না- এমনটাই মনে করছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।