নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা॥
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ ‘রাষ্ট্রপতি’ যদি কোনো কারণে শূন্য হয়, তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই সেই নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদে থাকা না-থাকা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে কমিশন এই আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে পদ শূন্য না হলে এই প্রক্রিয়া আপাতত কার্যকর হচ্ছে না।
ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি নিজেই একাধিকবার সংবাদমাধ্যমে তাঁর পদে না থাকার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহল থেকেও তাঁর অপসারণের দাবি উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনি বা সাংবিধানিক জটিলতা এড়াতে কমিশন ভেতরের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখছে।
প্রস্তুতির বিষয়ে যা বলছে কমিশন
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য রাখা যায় না। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। কোনো কারণে পদটি খালি হলে আমাদের দ্রুততম সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। একটি জাতীয় নির্বাচনের মতো এটি হুট করে করা সম্ভব নয়, তাই আমরা আগে থেকেই মানসিক ও দাপ্তরিক প্রস্তুতি রাখছি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি যদি বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন, তবে সেই সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে সেখানে উপ-নির্বাচন আয়োজনের একটি বাড়তি দায়বদ্ধতাও ইসির ওপর বর্তাবে। বিষয়টিকে কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রপতির বক্তব্য
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর এই আলোচনা নতুন মাত্রা পায়। রাষ্ট্রপতি স্বয়ং একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নতুন নির্বাচিত সরকার অনুরোধ করলে বা চাইলে তিনি পদত্যাগ করতে দ্বিধা করবেন না। তিনি বলেন, “নতুন সরকার আসলে… তারা বললে, অনুরোধ করলে (পদত্যাগ করব)। নির্বাচিত সরকার এসে যদি বলে আপনি থাকবেন না, তবে নতুন রাষ্ট্রপতি হবে। পৃথিবীতে এমন উদাহরণ তো আর কম নেই।”
সাংবিধানিক বিধিবিধান
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদ তিনটি উপায়ে শূন্য হতে পারে:
১. পদত্যাগ: অনুচ্ছেদ ৫০(৩) অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।
২. অভিশংসন: অনুচ্ছেদ ৫২ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে তাঁকে অভিশংসিত করা যেতে পারে।
৩. অসামর্থ্য: অনুচ্ছেদ ৫৩ অনুযায়ী, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে তাঁকে অপসারণ করা সম্ভব।
এছাড়াও ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা তিনি অনুপস্থিত বা অসুস্থ থাকলে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন পদ্ধতি ও যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক, অন্তত ৩৫ বছর বয়সী এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন বা বিশেষ প্রয়োজনে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচী নির্ধারণ করা হবে। যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে সংসদের কক্ষে গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে। সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তিই হবেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা অপসারিত হলে রমজানের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে এই নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে ঈদের আগেই নতুন রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।