নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ডেস্ক ॥
৩০ জানুয়ারি, ২০২৬: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; একই দিনে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক গণভোট। ভোটাররা আলাদা ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা। এই সংস্কার প্রস্তাবে জনগণের রায় ‘হ্যাঁ’ হলে সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সূচিত হবে আমূল পরিবর্তন।
সরকার সূত্রে জানা গেছে, গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সরাসরি সাংবিধানিক এবং বাকি ৩৭টি আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। গণভোটে প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে পরবর্তী সংসদ তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে; অন্যথায় জুলাই সনদ বাতিল বলে গণ্য হবে।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে পরিবর্তন
জুলাই সনদ কার্যকর হলে সংবিধানের বর্তমান মূলনীতি- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে নতুন মূলনীতি হবে: সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। নাগরিকদের পরিচয় ‘বাঙালি’র পরিবর্তে হবে ‘বাংলাদেশি’। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা বহাল থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য
প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে একাধিক লাভজনক পদে আসীন হতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে। অপরাধীকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতার বদলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থা
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত হতে যাচ্ছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ। উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০টি আসন, যা নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে। নারীদের সংরক্ষিত আসন পর্যায়ক্রমে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া, বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন প্রধান বিরোধী দল থেকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্য নিশ্চিত করা হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনেও প্রধানমন্ত্রীর একক প্রভাব কমিয়ে স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা ও বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিধান রাখা হয়েছে।
বিচার বিভাগ ও মৌলিক অধিকার
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং পৃথক বিচারক নিয়োগ কমিশনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ও ন্যায়পাল নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের অনুমোদন লাগবে। নতুন মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
যদিও এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্র সংস্কারের মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে বিএনপি ও কিছু রাজনৈতিক দল কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছে। ফলে গণভোটের এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক ও কৌতূহল সমানভাবে বিরাজ করছে। এখন দেখার বিষয়, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে দেশের মানুষ এই ‘জুলাই সনদ’কে গ্রহণ করে কি না।