কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র দখলে থাকা ঢাকার প্রবেশদ্বার খ্যাত ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসন পুনরুদ্ধারে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে বিএনপি। তবে এবার শুধু প্রতিপক্ষ নয়, জোটের সাবেক মিত্র জামায়াতে ইসলামীও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে এই দুই আসনে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচার-যুদ্ধ। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, প্রধান দুই দলের চার প্রার্থীই কোটিপতি, যা ভোটের লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঢাকা-২ আসন: আমানউল্লাহ আমানের সামনে জামায়াত বাধা
ঢাকা-২ আসনে (কেরানীগঞ্জ ও সাভারের অংশ বিশেষ) চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ধানের শীষের প্রচারণা। তবে শুরুতে একক আধিপত্যের আভাস থাকলেও জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় সমীকরণ বদলে গেছে। ৫ আগস্টের পর আব্দুল হক বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সরব থাকলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এতে ভোটের মাঠ এখন ত্রিমুখী লড়াইয়ের অপেক্ষায়।
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে কর্নেল (অব.) আব্দুল হক বলেন, “প্রশাসন বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়।” অন্যদিকে, আমানউল্লাহ আমান বলেন, “আমরা শান্তিতে বিশ্বাসী। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলাই আমাদের লক্ষ্য।”
৪ লাখ ১৯ হাজার ২০৭ ভোটারের এই আসনে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা (ইসলামী আন্দোলন) প্রতীকের মধ্যে মূল লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সাধারণ ভোটাররা। তারানগরের তরুণ ভোটার তানজিম হোসেন জানান, তিনি আধুনিক ও শিক্ষাবান্ধব প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।
ঢাকা-৩ আসন: গয়েশ্বর বনাম শাহীনুর লড়াইয়ের আভাস
ঢাকা-৩ আসনে (কেরানীগঞ্জ) চিত্র আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখানে ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও বৈধ ৯ জনের মধ্যে মূল আলোচনায় আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ঢাকা জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর শাহীনুর ইসলাম। ৫ আগস্টের পর থেকেই এই দুই নেতা এলাকায় গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, জামায়াত প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম নিজের ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে নির্বাচনের ব্যয় নির্বাহ করছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সমাজে অবৈধ অস্ত্রের দাপট রয়েছে। এগুলো উদ্ধার না করলে জনগণ কেন্দ্রে যেতে সাহস পাবে না।”
৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ ভোটারের এই আসনে গয়েশ্বর ও শাহীনুর ছাড়াও গণসংহতি আন্দোলনের বাচ্চু ভূঁইয়া (মাথাল) মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তরুণ ভোটাররা বলছেন, তারা মাদকুমুক্ত সমাজ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেন-এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
পরিসংখ্যান ও ইতিহাসের হাতছানি
ঢাকা-২ আসনটি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমানউল্লাহ আমানের দুর্গে পরিণত হলেও ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা চারবার ছিল আওয়ামী লীগের কামরুল ইসলামের দখলে। একইভাবে ঢাকা-৩ আসনেও ২০০৮ থেকে টানা চারবার জয়ী হয়েছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। দীর্ঘ সময় পর আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে বিএনপি তাদের হারানো রাজত্ব ফিরে পেতে চায়, আর জামায়াত চায় নিজেদের শক্তির জানান দিতে।
শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রায় কার পক্ষে যায়, তা দেখার জন্য এখন অধীর অপেক্ষায় কেরানীগঞ্জ ও সাভারবাসী।