নিজস্ব প্রতিবেদক , ঢাকা ॥
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেটের এই যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, অনুমতি ছাড়াই কারো ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে এটি কেবল নৈতিক অপরাধ নয়, বরং আইনের দৃষ্টিতে দণ্ডনীয় অপরাধ। ব্যক্তির গোপনীয়তা (Privacy) এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা (Data Protection) এখন নাগরিকের মৌলিক আইনি অধিকার।
সম্প্রতি আইন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে অনেকেই বিভ্রান্তিতে থাকেন যে কোন আইনে প্রতিকার মিলবে। আইনজ্ঞদের মতে, মূলত ফৌজদারি এবং দেওয়ানি-এই দুই পথেই প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
১. সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: নতুন দিগন্ত
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আইনি কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে “সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫” কার্যকর হয়েছে।
পরিবর্তন: এই নতুন অধ্যাদেশটি পূর্বের আইনের অপব্যবহার বন্ধ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
সুরক্ষা: মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু ধারা (যেমন- ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১) বাদ দেওয়া হলেও অনলাইন জালিয়াতি বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আইনি রক্ষাকবচ এখানে বিদ্যমান।
২. পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২
যদি অনুমতি ছাড়া প্রকাশিত ছবি বা ভিডিওটি যৌন সুড়সুড়িমূলক বা অশ্লীল প্রকৃতির হয়, তবে এই আইনটি অত্যন্ত কঠোর।
ধারা ৮ (১): কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার নগ্ন বা আংশিক নগ্ন ছবি/ভিডিও ধারণ, প্রকাশ বা প্রচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শাস্তি: এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে।
৩. দণ্ডবিধি ও মানহানির প্রতিকার
ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে যদি কারো সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়, তবে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ধারা ৪৯৯ ও ৫০০: মানহানিকর বক্তব্য বা ছবি প্রকাশ করে কারো সুনাম নষ্ট করলে ধারা ৫০০ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৪. দেওয়ানি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ
কেবল জেল-জরিমানা নয়, ভুক্তভোগী চাইলে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন।
আর্থিক ক্ষতিপূরণ: মানহানি বা তথ্য ফাঁসের ফলে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ (Compensation) চেয়ে মামলা করা যায়।
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: দ্রুত ছবি বা তথ্য ইন্টারনেট থেকে সরানোর জন্য দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশ অনুযায়ী আদালতের কাছে ‘অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা’ (Injunction) চাওয়া সম্ভব।
আইনজ্ঞদের পরামর্শ: আক্রান্ত হলে যা করবেন
১. প্রমাণ সংগ্রহ: দ্রুত ওই পোস্ট বা তথ্যের স্ক্রিনশট, লিংক এবং প্রকাশের তারিখ ও সময় সংরক্ষণ করুন।
২. জিডি বা অভিযোগ: নিকটস্থ থানার সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গিয়ে লিখিত অভিযোগ বা জিডি করুন।
৩. আইনি সহায়তা: বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সাইবার ট্রাইব্যুনাল বা দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করুন।
ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। আইন সম্পর্কে সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই পারে অপব্যবহার রোধ করতে।