নিজস্ব প্রতিবেদক ও ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা ॥
জাগতিক জীবনের মায়া ত্যাগ করে মহান সৃষ্টিকর্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী, আপসীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ অসুস্থতার পর গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ ও দীপ্তিময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
আজ বাদ জোহর দুপুর ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মরহুমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় নারীদের অংশগ্রহণের জন্য রাখা হয়েছিলো বিশেষ ব্যবস্থা। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে স্বামী, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। জানাজায় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ মেট্রো রেল চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
রাষ্ট্রীয় শোক ও সাধারণ ছুটি
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া দেশের মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকবেন।” গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে আজ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ একদিনের সাধারণ ছুটি এবং তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। উক্ত বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন।
শ্রদ্ধা ও শোকের ছায়া
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর গুলশান কার্যালয়ে খোলা শোক বইয়ে ইতোমধ্যে ২৮টি দেশের কূটনীতিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্বাক্ষর করেছেন। বিএনপি পক্ষ থেকে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। জানাজা ও দাফনকার্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ১০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিলো। আজ সকালে হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রিয় নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জনতা।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারী ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তিন দফায় তিনি দেশের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর চরম রাজনৈতিক সংকটে তিনি বিএনপির হাল ধরেন এবং আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটান।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: মাদার অব ডেমোক্রেসি
গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর ত্যাগ ও লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়া ২০১১ সালে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করে।
দীর্ঘ কারাবাস ও ত্যাগ
বেগম জিয়া তাঁর জীবনে বহুবার কারাবরণ করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই শিশুপুত্রসহ পাক বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়া থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৮ সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলায় প্রায় আড়াই বছর পরিত্যক্ত কারাগারে নির্জন প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। কোনো জুলুম-নির্যাতনই তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
শোকাচ্ছন্ন পরিবার ও দল
মৃত্যুকালে তাঁর পাশে ছিলেন নির্বাসন থেকে ফেরা জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। মায়ের মৃত্যুতে আবেগঘন এক বার্তায় তারেক রহমান দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অবিচল অভিভাবক। তাঁর এই প্রস্থান দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।