নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ॥
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক ‘মহানায়কের’ বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত গণসংবর্ধনায় লক্ষ-কোটি মানুষের উপস্থিতিতে তিনি এক ঐতিহাসিক ও রাজসিক অভ্যর্থনায় সিক্ত হন। এই জনসমুদ্র স্মরণ করিয়ে দিয়েছে নব্বইয়ের দশকে নেলসন ম্যান্ডেলার কারামুক্তি পরবর্তী সংবর্ধনার কথা; তবে উপস্থিতির সংখ্যা ও আবেগের দিক থেকে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছে।
মাটি ও মানুষের টানে আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে লন্ডন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তিনি দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। কবিগুরুর ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গানের সুর যেন মূর্ত হয়ে ওঠে, যখন তিনি খালি পায়ে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে পরম মমতায় নিজ জন্মভূমির এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নেন। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরিহিত তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা বিমানবন্দর কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মী ও সাধারণ মানুষের সাথে তিনি হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন।
ম্যান্ডেলার সংবর্ধনাকেও ছাপিয়ে গেল ঢাকার জনসমুদ্র
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯০ সালে জোহানেসবার্গে নেলসন ম্যান্ডেলার সংবর্ধনায় যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, ঢাকার ৩০০ ফিট এলাকার জনসমুদ্র তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা বাসে দাঁড়িয়ে থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতার অভিবাদনের জবাব দিতে দিতে তিনি সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছান। শুধু বিএনপি নয়, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এনসিপি ও সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও এই সংবর্ধনায় যোগ দিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নিয়ামত’ হিসেবে অভিহিত করেন।
‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: আগামীর রূপরেখা
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ উক্তির আদলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে তারেক রহমান বলেন, “আমার দেশের মানুষের জন্য, আমার দেশের জন্য আমার কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে (I have a plan for the people of my country, for my country)।” কোনো লিখিত বক্তব্য ছাড়াই ১৬ মিনিটের এক তেজস্বী ভাষণে তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন।
তিনি বলেন, “জনগণের ভোটে আগামী দিনে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে আমরা নবী করিম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদলে দেশ গড়ব। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন মা নিরাপদ বোধ করবেন এবং প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফিরে আসতে পারবেন।”
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি ও সমতলের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৭৫-এর সিপাহি-জনতার বিপ্লব, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে তিনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। রাজনীতির এই ‘জাদুকর’ বারবার মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করেন এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিহার করে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেন।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং সালাহউদ্দিন আহমদের সঞ্চালনায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ। এছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক সাইফুল হক, আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, তানিয়া রব, নুরুল হক নুর, ববি হাজ্জাজসহ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল গড়াতেই জনসমুদ্র থেকে নেতার নতুন দিকনির্দেশনা নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন লাখো মানুষ। তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করল বলে মনে করছেন সাধারণ জনগণ।