মালু পাড়ার মেয়ে পারু: দ্বিতীয় পর্ব
লেখক: আসাম্বর ॥
মোটামুটি ঘটা করেই পারুর সাত পাকে ঘোরা সম্পন্ন হলো। নতুন বধূ হিসেবে পারু শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। কিন্তু সেখানে পা রেখেই তার সব স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। পারুর কাছে শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ একেবারেই অসহনীয়, কিন্তু বিধির বিধানে সে নিরুপায়। স্বামীর বাড়ির কৃষ্টি-কালচার, আর চারদিক থেকে ভেসে আসা পঁচা মাছের আইশটে গন্ধ-সব মিলিয়ে এক দমবন্ধকর অবস্থা। এর ওপর পারুর স্বামী, কালুরাম জলদাসের শরীর থেকেও এক ধরনের বিরক্তিকর দুর্গন্ধ আসতো। সবকিছু মিলিয়ে পারু নিজেকে এক অস্থির ও অস্বস্তিকর পরিবেশে আবিষ্কার করলো।
এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে বারবার মনে পড়তে লাগলো পারুর রক্ষাকর্তা সেই মুসলিম যুবক নূরের কথা। পারু মনে মনে তাকেই দোষারোপ করতে লাগলো-কেন সে আসেনি তাকে বাঁচাতে! বারবার মনে হতে লাগলো, “নূরের শরীরের সুঘ্রাণ আজও আমার নাকে শিহরণ জাগায়, অথচ আমার স্বামী কালুরাম জলদাস তার ঠিক উল্টো!” নূরের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ল-কত আনন্দ, কত নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা ছিল সেই সম্পর্কে, যা আজ সে নিজ জাতের মানুষের কাছেও অনুভব করতে পারছে না।
নিজেকে প্রশ্ন করে পারু-কেন সে শুধু মায়ের কথায় এমন ভুল করলো? সত্যিই কি মানুষের জাত বলে কিছু আছে? মা কি শুধু ধর্মের নামে মিথ্যা অপব্যাখ্যা দিয়ে তাকে ঠকিয়েছেন? পারুর কাছে তার মা আজ মিথ্যাবাদী, যিনি মিথ্যা বলে তাকে ঠকিয়েছেন। নূরের ভালোবাসা তার কাছে অতুলনীয়, সে যেন এক ‘মহা পুরুষ’!
পারু এখন আত্মগ্লানিতে ভুগছে, মনের যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আত্মহননের আগুনে জ্বলছে। স্বামী ও সংসার তার কাছে দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠলো।
নূরের ফিরে আসা ও পারুর অন্তিম পরিণতি
কয়েক মাস পরের ঘটনা। নূর এলো পারুদের বাড়িতে, পারুকে একেবারে নিয়ে যেতে। পারুর মাকে উদ্দেশ করে সে বললো, “মাসিমা, পারুকে ডাকুন, আমি তাকে নিয়ে যেতে এসেছি।”
পারুর মা অবাক হয়ে বললেন, “বাবু, পারুর তো বিয়ে হয়ে গেছে!”
নূর এ কথা শুনে বিস্মিত, হতবাক, আর অসম্ভব বলে এক আত্মচিৎকার করে উঠলো! অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সে পারুর মাকে জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় বিয়ে দিলেন? ছেলের নাম পরিচয় কী?”
মা উত্তর দিলেন, “ছেলের নাম কালুরাম জলদাস। সে আমাদের জাতের প্রথম ম্যাট্রিক পাস! বাপের পেশা মাছধরা, আর ছেলের পেশা শুঁটকি ব্যবসা।”
নূর সব শুনে দু’চোখের জল ফেললো। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ব্যথায়, এক অশান্ত মন নিয়ে সে ফিরে গেল নিজের শহরে, নিজের প্রাসাদে।
অল্প কিছুদিন পর পারু বাপের বাড়িতে এলো। এসেই জানতে পারলো, নূর তাকে নিয়ে যেতে এসেছিল। এই খবর শোনার পর থেকেই পারু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিল। সে সবার সাথে পাগলীর মতো আচরণ করতে লাগলো। পারু তার মাকে দায়ী করে সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করলো-“হে ভগবান, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! অতঃপর তুমি নূর সাহেবকে ভালো রেখো।”
নূরের শোকে পারুর আস্তে আস্তে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটলো। সে পাগলী হয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতে লাগলো। কিছুদিন পর সে পাড়া-গ্রাম ছেড়ে বহু দূরে চলে গেল, আর কখনও ফিরে আসেনি।
এদিকে পারুর মা-বাবা ও স্বামী তার নিখোঁজ বার্তা ছাপিয়ে সংবাদপত্রে প্রচার করে: “পারু নিখোঁজ!!”