মালু পাড়ার মেয়ে পারু
লেখক: আসাম্বর ॥
গল্পের শুরু মালু পাড়ায়। সেখানে বাস পারু নামের এক কিশোরীর, যার বয়স সবে চৌদ্দ ছুঁয়েছে। দেখতে গোলগাল, ফুটফুটে, এক কথায় সুরূপা সুন্দরী। তাকে দেখলে শুধু মুসলিম পাড়ার ছোকরা কেন, বৃদ্ধের জিভেও জল আসত। এই অপরিণত বয়সেই পারুর বাবা-মায়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ-মেয়ের বিয়ের জন্য তাঁরা যেন হন্যে।
এমন সময় প্রতিবেশী বাড়িতে বেড়াতে এলেন এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি, নাম তরু। স্বভাবে তিনি আধা-পাগল! সেই প্রতিবেশীই তরুর সাথে পারুর বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, পারুর বাবা-মা এই প্রস্তাবেই দারুণ খুশি! এক বৃহস্পতিবার বিকেলে পারুর বিয়ে হয়ে গেল তরুর সাথে। কেবল কিশোরী পারু বুঝতে পারেনি নিয়তি তার জন্য কী কঠিন খেলা সাজিয়ে রেখেছে।
বিষাদের মেঘ ও বারমুডা ট্রায়াঙ্গল
কয়েকটি বছর কেটে গেল। একদিন এক পূজার অনুষ্ঠানে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই বেড়াতে যায়। সেই রাতে মদ্যপানের ফলে তরুর অকাল মৃত্যু ঘটে।
স্বামীর মৃত্যুশোক সইতে পারল না পারু। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, এই জীবন বৃথা। খরস্রোত বাহী যমুনার জলে ঝাঁপ দিল সে-আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে। এক মুহূর্তের মধ্যে পারু ভেসে গেল যমুনা, পদ্মা, মেঘনা ছেড়ে। বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে, একেবারে কুখ্যাত বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ঘূর্ণিপাকে!
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরল সে। অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত মুসলিম যুবক, নাম নূর।
নতুন জীবন, নতুন দিগন্ত
নূর পরম সেবা-শুশ্রূষায় পারুকে সুস্থ করে তুললেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ আছে?” পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আছে, কিন্তু না থাকার মতোই।”
এরই মধ্যে পারুর সঙ্গে নূরের গড়ে উঠেছে এক গভীর আত্মার সম্পর্ক। নূর তাকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুললেন, নতুন করে গড়ে দিলেন পারুর ব্যক্তিত্ব। নূর মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করলেন-কীভাবে ভবিষ্যতে পারুকে নিয়ে ভালো থাকবেন। পারুও মনে মনে মহা খুশি; জীবনে এমন একজন মানুষই তার দরকার ছিল, এবার তাকে যেন পেয়েই গেল!
আগের চেয়ে পারু এখন দ্বিগুণ সুন্দরী, যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা অপ্সরা!
নূর একদিন পারুকে বললেন, “তুমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক। চলো, তোমাকে তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিই।” পারু সানন্দে রাজি হলো।
স্বপ্নের সমাধি
পারুর বাবা-মা ধরেই নিয়েছিলেন তাদের মেয়ে মারা গেছে। হঠাৎ পারুর ফিরে আসা দেখে তাঁরা আনন্দে আত্মহারা। এ যেন তাদের পারু নয়, সাক্ষাৎ এক দেবীর আবির্ভাব!
নূর বললেন, “আমি এবার আসি।”
পারু অশ্রুসজল চোখে মা-কে জড়িয়ে ধরে বললো, “মা, তাকে যেতে দিও না। আমি তাকে খুবই ভালোবাসি, আমার জীবনে তাকে খুব দরকার! তাকে ছেড়ে আমি বাঁচব না!”
মেয়ের অনুরোধে এবং নূরের প্রতি ভালোবাসার টানে পারুর বাবা-মা অনুরোধ করলেন নূরকে এক রাত তাদের বাড়িতে থাকতে। কিন্তু সেই বাড়ি ছিল খড়কুটোর তৈরি, সেখানে খাট-পালং বলতে কিছুই নেই। সমাজের উঁচু স্তরের এই ছেলেটি অনেক কষ্টে সেই রাত পোহালো।
শহরে ফিরে আসার সময় নূর পারুকে বললেন, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমারে না পেলে জীবন মোর হবে মিছে।” অনেক অনুনয়-বিনয় করে নূর শহরে ফিরে এলেন।
জাতের বেড়াজাল ও প্রত্যাবর্তন
এর কিছুদিন পরই পারুর জন্য একটি বিয়ের প্রস্তাব এলো। ছেলে উচ্চ শিক্ষিত, স্ব-জাতের, স্ব-গোত্রের। এমন ছেলে নাকি লাখে একটা হয়!
পারুর মা তখন তার মেয়েকে যত ধরনের কুসংস্কার আছে, সব অক্ষরে অক্ষরে তুলে ধরলেন। “ঐ ছেলে মুসলিম আর আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের নিম্নজাত (শীল)। আমাদের গোত্র ‘জলদাস’। মুসলিম ছেলের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ভগবান সইবেন না!”- মায়ের এই কথাগুলো পারুর মনকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
প্রচলিত আছে মেয়েরা চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়। হয়তো তারই প্রমাণ মিলল এখানে। পারু সব ভুলে গেল। সে তার জাত চিনতে আর ভুল করলো না। অতীতের উদ্ভট ঘটনা ভুলে নিজের জাত ও স্ব-গোত্রের ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হলো।
নিজেদের অস্তিত্ব ও সমাজের কঠিন বাঁধন হয়তো পারুকে ফিরিয়ে আনলো তার চেনা গণ্ডিতে।
ছেলের নাম ও পরিচয় জানতে চোখ রাখুন দ্বিতীয় পর্বে।