আইন-আদালত ডেস্ক ॥
ঢাকা: দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ভোগান্তির পর অবশেষে সংশোধন করা হলো ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ (আমমোক্তারনামা) বিধিমালা, যার ফলে প্রবাসীরা এখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়াই জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ ব্যবহার করে বিদেশে বসেই তাদের আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক আনীত এই সংশোধনীকে ‘খুশির খবর’ হিসেবে দেখছেন বিদেশে বসবাসরত বহু বাংলাদেশি, যাদের অনেকে পূর্বের কঠোর নিয়মের কারণে দেশে থাকা সম্পত্তির খাজনা দিতেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
পাসপোর্ট নিয়ে বাধার অবসানের অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় বিশ বছর ধরে প্রবাসী এবং বর্তমানে সে দেশের নাগরিকত্বপ্রাপ্ত সাইদুর রহমান তাদের মধ্যে একজন, যিনি সংশোধনের সুবিধা সরাসরি পাচ্ছেন। বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় বছর দুয়েক আগে দেশে এসেও তিনি তার পৈতৃক সম্পত্তির খাজনা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, “আগেরবার দেশে যাওয়ার পরে আমি বেশ কয়েকবার ভূমি অফিসে গিয়েছি, আমি অনেক চেষ্টা করেও খাজনাটাই দিতে পারিনি। এবার পাওয়ার অব অ্যাটর্নির রুলসে পরিবর্তন করার কারণে আমাদের ঝামেলা কমল। আশা করছি নতুন নিয়ম অনুযায়ী আমার কাজটা সহজেই সম্পন্ন করতে পারব।”

সরকারের প্রতিশ্রুতি ও আইন উপদেষ্টার বক্তব্য
সরকার প্রধান স্বয়ং ৬ জুন ঈদুল আজহার ভাষণে এই সংশোধনের কথা উল্লেখ করে এটিকে ‘প্রবাসী ভাই-বোনদের অনেকদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে’ করা হয়েছে বলে জানান।
এর আগে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক সংবাদ সম্মেলনে এই সংশোধনের ঘোষণা দিয়ে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে জটিলতা অবসানের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “২০১৫ সালের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা নিয়ে প্রবাসীরা প্রচুর অভিযোগ করতেন। এই বিধিমালা অনুযায়ী কেউ যদি পাওয়ার দিতে চাইত, তবে তার পাসপোর্ট থাকা লাগত… প্রবাসীদের সন্তানরা অনেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেন না। তাদের পক্ষ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হতে গেলে অনেক জটিলতা হত।”
সংশোধন অনুযায়ী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ‘no visa required’ স্টিকার সংবলিত বিদেশি পাসপোর্ট, জন্ম সনদ, কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও তারা বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারবেন।
সুবিধা ও আইনগত দিক:

আইনজীবী ইসফাকুর রহমান গালিবের মতে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হয়েছে। পূর্বের বিধিতে পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক থাকায় অনেকের জন্য এটি অসম্ভব, বিলম্ব ও খরচ বৃদ্ধি করত। নতুন নিয়মে পাসপোর্টের পরিবর্তে জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের সুযোগ প্রবাসীদের ‘ভোগান্তি লাঘবে’ বিরাট ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি আরও মনে করেন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মূল সমস্যা সম্পত্তি লেনদেনে থাকায় এটিকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক করতে সংশ্লিষ্ট আইনের ‘একীভূত সংস্কার’ প্রয়োজন।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কী?
‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামা হলো একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (পাওয়ার দাতা) অন্য একজনকে (মোক্তার বা অ্যাটর্নি) তার আইনি প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। এই প্রতিনিধি মালিকের পক্ষে সম্পত্তি দেখাশোনা, ক্রয়-বিক্রয়, নিবন্ধন বা অন্য যে-কোনো আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন। এটি অবশ্যই লিখিত আকারে হতে হয়।
প্রকারভেদ: এটি সাধারণত দুই ধরনের: সাধারণ মোক্তারনামা (বিস্তৃত ক্ষমতা) এবং বিশেষ মোক্তারনামা বা খাসমোক্তারনামা (নির্দিষ্ট কাজের জন্য)।
নিবন্ধন: জমিজমা বা স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত মোক্তারনামা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। বিদেশে সম্পাদিত দলিল সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রত্যয়ন করে দেশে পাঠিয়ে কার্যকর করা হয়।
পুরোনো আইন ও বর্তমান পরিবর্তন
অবিভক্ত ভারতে ১৮৮২ সালে প্রণীত ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অ্যাক্ট ১৮৮২’ রহিত করে ২০১২ সালে নতুন আইন পাস হয়। ওই আইনের অধীনে ২০১৫ সালে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা প্রণীত হয়। ১০ বছর পর, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিধিমালাটির গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার।

পরিবর্তনগুলো হলো:
পরিচয় যাচাই: পাওয়ার দাতার পাসপোর্টের বিবরণের বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়ে এর পরিবর্তে No Visa Required স্টিকার সংবলিত বিদেশি পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদের বিবরণ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
দলিল প্রেরণ: বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রামাণিকরণের ছয় মাসের মধ্যে তা ও তার প্রতিলিপি বাংলাদেশে পাঠানোর নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
রাজউক ও আমমোক্তারনামা:

২০২৩ সাল থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্লট ও ফ্ল্যাটের বরাদ্দ ও ইজারা গ্রহণে আমমোক্তার নিয়োগ বা বাতিলের ক্ষেত্রে রাজউকের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করেছে। ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধে এটি করা হয়েছে। প্রবাসীরা এখন সশরীরে উপস্থিত না থেকেও দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে রাজউকের অনুমোদন নিতে পারবেন।