বিশেষ প্রতিনিধি, (আশুলিয়া) ঢাকা ॥
সাভার: আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব নিয়েই তিনি থানাকে যেন ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। ঘুষ লেনদেন, মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং পোস্টিং বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডে তার বিরুদ্ধে এক বিরল নজির স্থাপনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে খোদ পুলিশের কর্মকর্তারা।
দুর্নীতির চক্র: পোস্টিং ও বদলি বাণিজ্য
জানা যায়, গত ২৫ জুন ওসি আব্দুল হান্নান আশুলিয়া থানায় যোগ দেন। তার যোগদানের পূর্বে মাত্র চার মাসের মধ্যেই বিভিন্ন অভিযোগে চারজন ওসি (আবু বক্কর, নুরে আলম ফকির, সোহরাব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম ডাবলু) ক্লোজড হন।
ওসি হান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি থানায় যোগদানের পরপরই পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ‘সিভিল টিম’ তৈরি করেন এবং শুরু হয় অর্থ লেনদেনের নানা অধ্যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, “ওসি হান্নান একজন স্বার্থপর কর্মকর্তা, তার টাকা কালেকশনের জন্য আলাদা লোক রয়েছে। আমি তাকে টাকা কালেকশন করে দেইনি বলেই আমাকে কুকুরের মতো খাটিয়ে দ্রুত বদলি করিয়েছেন।”
বদলি বাণিজ্যের শিকার আরেক এসআই আফসোস করে বলেন, “ভালো কাজ করেও লাভ হয়নি। ওসি স্যার নিজের কাছের অফিসারকে আনার জন্য আমাকে সরিয়ে দিলেন। আমি অন্যদের মতো তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে পারিনি।”
হত্যা মামলায় ছাড় ও নিয়মিত মাসোহারা
ওসি হান্নানের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর বা হালকা ধারার মামলা দেওয়া হয়। ফলে অভিযুক্তরা সহজেই জামিন পেয়ে যান। এসব অবৈধ কাজে সহযোগিতা না করায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে অন্য জেলায় বদলি করানো হয়েছে।
মাসোহারা আদায়: আশুলিয়ার জুয়ার আসর, অবৈধ মাটি কাটা ও সরকারি জায়গা দখলসহ প্রায় সব অবৈধ কার্যক্রম থেকে ওসি হান্নান নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বহিরাগত সংগ্রাহক: থানার বাইরে থেকে আব্দুল হামিদ নামের এক ব্যক্তি মাঠপর্যায়ের সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন এবং সরাসরি ওসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ওসির সাবেক বডিগার্ড নুরনবি জানান, “হামিদ নামের একজন প্রায় সময় স্যারের রুমে বসে থাকতেন। তারা গোপনে সব কথাবার্তা বলতেন।”
ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ছাড় ও রাজনৈতিক যোগসাজশ
ওসি হান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঢাকা ২০ (বিশ) আসনের সাবেক এমপি বেনজির আহমেদের বিয়াই সাহেব আমিন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ আমিনুল ইসলাম, যিনি মানবতাবিরোধী ৫২ নং মামলার ৯ নং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। উল্টো প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিয়ে তাকে পলাতক দেখানো হচ্ছে। অভিযোগ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে যে, আমিনুল ইসলাম কবরস্থান রোড, পূর্ব ডেন্ডাবর, পল্লী বিদ্যুৎ, সাভার ক্যান্টনমেন্ট, আশুলিয়া, সাভার ঢাকায় তার আবাসিক ভবন নাসরিন ম্যানসনে নিয়মিতভাবে বসবাস করছেন। তাকে জন সম্মুখে বাজার ও অফিস করতে দেখা গেলেও পুলিশ তাকে পলাতক দেখিয়ে মাসোহারা নিচ্ছে।
এছাড়াও, যুবদলের এক নেতার সাথেও ওসির বন্ধুর মাধ্যমে প্রতি মাসে মাসোহারা পাঠানোর চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বোনজামাইয়ের অবৈধ ব্যবহার ও ওসির বক্তব্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওসি হান্নান তার আপন বোনজামাইকে অবৈধভাবে নেওয়া ঘুষের টাকা সরাতে ব্যবহার করেন। তার ব্যবহৃত পুলিশের গাড়িটিও বোনজামাই ব্যবহার করেন। বোনজামাই সারাদিন ওসির অফিস কক্ষে বসে থাকেন এবং ওসির সঙ্গে বিভিন্ন তদন্তেও যান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, “আমি কোনো মামলা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই বা কাউকে পোস্টিং করাইনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখে।” তবে বোনজামাইকে সঙ্গে রাখার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি একা থাকতে পারি না। একা থাকতে ভয় পাই। তাই আমার আপন বোনজামাইকে নিয়ে আসছি। তিনি আমার কাছে থাকেন।”
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, “পোস্টিং পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে তার বোনজামাই যদি থানায় থাকে, সেটি ঠিক নয়। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”