ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা ॥
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস আর সংবিধান যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তখন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবস্থা হয় ত্রাহি মধুসূদন। সম্প্রতি মহেশপুরের ইউএনও-র বদলি এবং তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক গভীর ক্ষতকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
আইনি সুরক্ষা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
মহেশপুরের ইউএনও যখন সাফ জানিয়ে দেন যে, ‘সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো নাম ঘোষণা করা সম্ভব নয়’, তখন তিনি মূলত আইনের শাসনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আইন ও সংবিধান কি আদৌ কখনো নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে?
আওয়ামী লীগ আমল: বিগত শাসনামলে সংবিধানকে ব্যবহার করে ইতিহাস থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলার একতরফা চেষ্টা আমরা দেখেছি। এমনকি বীর উত্তম খেতাব নিয়ে যে ধরনের রাজনৈতিক চর্চা হয়েছে, তা ছিল চরম প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপির বর্তমান অবস্থান: বর্তমানে বিএনপি একদিকে বলছে তারা ‘সংবিধানে হাত দেবে না’, আবার মাঠ পর্যায়ে জিয়াউর রহমানকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য অনড়। এটি একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী নীতি। কারণ বর্তমান সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে লিপিবদ্ধ। যদি সংবিধানে পরিবর্তন না আসে, তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা আইনত বর্তমান দলিলে যা আছে তা-ই মানতে বাধ্য।
প্রশাসন যখন ‘বলির পাঁঠা’
মহেশপুরের ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে- ইউএনও যদি বর্তমান সংবিধানের প্রতিফলন ঘটান, তবে তার ওপর কেন চড়াও হতে হবে? এখানে কি যুক্তির চেয়ে দলীয় আবেগ আর জেদ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে? বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কর্মকর্তাদের মেরুদণ্ড নিয়ে চলাই দায় হয়ে পড়েছে। সংবিধান মানলে এক পক্ষ নাখোশ, আর দলীয় এজেন্ডা না মানলে অন্য পক্ষের রোষানল- প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এখন কেবলই কাগজে-কলমে।
“ইতিহাস কোনো প্লাস্টিক সার্জারির টেবিল নয় যে, যখনই যে ক্ষমতায় আসবে সে তার পছন্দমতো এর নাক-মুখ পাল্টে দেবে।”
স্ববিরোধিতা ও ব্যবস্থার ভাঙন
বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ যখন সংবিধান অপরিবর্তিত রাখার কথা বলেন, অথচ মাঠ পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের নাম না নেওয়ায় প্রশাসনকে শাসানো হয়- এই স্ববিরোধিতা প্রমাণ করে রাজনৈতিক দলগুলো আসলে স্থিতিশীল সিস্টেম নয়, বরং নিরঙ্কুশ ‘কর্তৃত্ব’ চায়।
ইউএনও-র এই আকস্মিক বদলি প্রমাণ করে যে দেশে শক্ত কোনো ‘সিস্টেম’ গড়ে ওঠেনি। এখানে ক্ষমতার দাপটই শেষ কথা। স্বাধীনতার ঘোষকের বিষয়টি ইতিহাসের পাতায় ও মানুষের হৃদয়ে মীমাংসিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমরা সেটাকে বানিয়েছি বদলি আর প্রতিহিংসার হাতিয়ার।
শেষ কথা
এই যদি হয় বাস্তবতা, তবে আগামীতে কোনো সরকারি কর্মকর্তা কি আর সত্য বলা বা আইন মানার সাহস পাবেন? নাকি সবাই ‘তেলবাজি’র মাধ্যমে নিজের চেয়ার টিকিয়ে রাখাকেই শ্রেয় মনে করবেন? মহেশপুরের এই ঘটনা আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দৈন্যদশাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
সূত্র: ইঞ্জিনিয়ার সুজন আহমেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যান্ডেল থেকে সংগৃহীত তথ্য