নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, সংসদীয় ডেস্ক ॥
ঢাকা: বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য রাজনীতিক ও খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। ভোলা-৩ আসন থেকে টানা সাতবার নির্বাচিত এই প্রবীণ সংসদ সদস্যকে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ ২০২৬) দুপুর ১২টার পর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। নবগঠিত বিএনপি সরকারে তিনি একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন।
রণাঙ্গনের নায়ক ও বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন
১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্মগ্রহণ করা হাফিজ উদ্দিন আহমদের রক্তে মিশে আছে রাজনীতি। তাঁর পিতা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদের দুবারের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।
১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসে তরুণ অফিসার হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তিনি। টানা আট ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধ শেষে দুই শতাধিক সৈনিক নিয়ে তিনি সেনানিবাস ত্যাগ করেন এবং যশোর-খুলনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। জুলাই মাসে কামালপুর বিওপি আক্রমণে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’-এ ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
একটানা সাতবারের জনপ্রতিনিধি
হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত গৌরবময়। তিনি ভোলা-৩ (লালমোহন-তজমুদ্দিন) আসন থেকে ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও বর্তমান ১৩তম সংসদসহ মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য। এর আগে তিনি বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং পানিসম্পদ, বাণিজ্য ও পাট মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাঠ কাঁপানো দ্রুততম মানব ও ফুটবলার
রাজনীতি ও যুদ্ধের পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তাঁর পদচারণা কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘দ্রুততম মানব’ ছিলেন। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে ১৯৭০ সালে তেহরানে আরসিডি প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেন। ঘরোয়া ফুটবলে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ১২ বছর খেলেছেন এবং ১৯৭৬ সালে দলটির অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফিফা’ তাঁকে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে ‘সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট’ সম্মাননা প্রদান করে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী দিলারা হাফিজ একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। তিনি ইডেন মহিলা কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে- শাহরুখ হাফিজ, শামামা শাহরীন হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
শপথ গ্রহণ শেষে নবনির্বাচিত স্পিকার সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা সমুন্নত রাখতে এবং সংসদের মর্যাদা রক্ষায় সকল সদস্যের সহযোগিতা কামনা করেন।