হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ॥
সেদিন ভোরবেলা। কুয়াশাচ্ছন্ন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা-সদরপুর গ্রাম। স্কুলব্যাগের ভেতর কয়েকটা জামাকাপড় আর একরাশ জেদ নিয়ে ঘর ছেড়েছিল এক কিশোর। যাওয়ার আগে পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে গিয়েছিল একটি চিরকুট। সেখানে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা ছিল মাত্র একটি বাক্য-“মানুষের মতো মানুষ হয়েই তবে আমি বাড়ি ফিরব।”
সেই কিশোর নাসিম আল আওয়াল আজ আর শুধু গ্রামের চঞ্চল ছেলেটি নন। জীবনের তপ্ত রেললাইন আর বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি পেরিয়ে তিনি এখন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট জাপানের ‘ক্লাউড অপারেশন অ্যান্ড ইনোভেশন’ (CO+I) টিমের একজন গর্বিত ইঞ্জিনিয়ার।
আদর্শের পাঠশালা ও শৈশব
নাসিমের বাবা মো. রবি ছিলেন পাবনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কিন্তু ১৯৯৬ সালে দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে সেই ‘সোনার হরিণ’ চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর অভাব আর টানাটানির সংসার শুরু হলেও বাবার সেই আদর্শই ছিল নাসিমের মূল পাথেয়। গ্রামের মানুষের কাছে নাসিম পরিচিত ছিলেন ‘কবি’ নামে। শুধু ছন্দের জন্য নয়, বরং জগৎকে দেখার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। পাড়ার নষ্ট ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস সারিয়ে দেওয়া ছিল তার শখ। সেখান থেকেই প্রযুক্তির প্রতি তার প্রথম টান।
মায়ের ছাগল বিক্রি আর স্বপ্নের শুরু
কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পড়ার সময় ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য কোনো ডিভাইস ছিল না নাসিমের। অভাবের সংসারে মা মোছা. নাজমা নিজের একটি ছাগল বিক্রি করে ছেলেকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেন। সেই ফোনকে মডেম বানিয়েই নাসিম ডুব দিয়েছিলেন তথ্যপ্রযুক্তির মহাসমুদ্রে। ইউটিউব দেখে শেখা, আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রশ্ন করা আর তিল তিল করে নিজেকে গড়ার কাজটা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।
জাপান যাত্রা ও সংগ্রামের দিনগুলো
উচ্চশিক্ষার জন্য জাপান যাওয়ার সুযোগ এলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। পরিচিতজনদের অবহেলা ডিঙিয়ে ব্যাংক ঋণ আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় তিনি পাড়ি জমান সূর্যোদয়ের দেশে। শুরুতে নাগোয়ার একটি গাড়ি কারখানায় প্রোডাকশন লাইনে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। সেই কঠিন সময় সম্পর্কে নাসিম বলেন, “ওই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে টিকে থাকার জন্য শুধু সাহস নয়, ধৈর্যেরও প্রয়োজন।”
ব্যর্থতা যখন সিঁড়ি
২০২০ সালে করোনার ডামাডোলে ‘এনটিটি কমিউনিকেশনস’-এ নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে স্বপ্ন ছিল আরও বড়। একে একে আমাজন, গুগল, অ্যাপল আর ওরাকল থেকে এসেছে প্রত্যাখানের চিঠি। এমনকি ২০২২ সালেও মাইক্রোসফট থেকে একবার ‘না’ শুনতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু নাসিম দমে যাননি। প্রতিটি ব্যর্থতাকে তিনি নিয়েছেন একেকটি নতুন প্রশ্ন হিসেবে, যার উত্তর খুঁজেছেন ক্রমাগত শেখার মাধ্যমে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই শুধু শুনে আর দেখে আয়ত্ত করেছেন জাপানি ভাষা।
সাফল্যের শিখরে
অবশেষে সেই স্বপ্নের দরজা খোলে। কয়েক ধাপের কঠিন ইন্টারভিউ পেরিয়ে নাসিম সুযোগ পান মাইক্রোসফটে। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির আজুর (Azure), মাইক্রোসফট ৩৬৫ এবং এক্সবক্স-এর মতো বিশাল ক্লাউড অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত।
তরুণদের প্রতি বার্তা
নিজের এই দীর্ঘ যাত্রার কথা স্মরণ করে নাসিম আল আওয়াল বলেন, “ডিগ্রি কেবল একটি কাগজ, দক্ষতাই আসল পরিচয়। আমি অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। বাংলাদেশের তরুণদের মেধার অভাব নেই, শুধু প্রয়োজন ধারাবাহিকতা আর নিজের ওপর বিশ্বাস।”
ড্রয়ারে লিখে যাওয়া সেই চিরকুটের কথা এখন নাসিমের কাছে এক বড় প্রেরণা। কুষ্টিয়ার সেই ‘কবি’ আজ আর শুধু নিজের জন্য নন, বরং হার না মানা এক প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে তুলে ধরছেন।