রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক ॥
রাষ্ট্রের যত আয় তার সবটুকু যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো তবে এই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এমন দৈন্যদশা থাকতো না। সরকারি পাওনা তথা ভ্যাট, ট্যাক্স কিংবা খাজনা- সব যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যায় না। মানুষ যত কেনাকাটা করে সেগুলোর ভ্যাট যদি সরকারি তহবিলে যেতো তবে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ফুলেফেঁপে কবেই মোটাতাজা হতো। সার্বিক ও সামগ্রিক উন্নয়নে আরও গতি পেতো। কিন্তু সর্বত্রই নীরব সিস্টেমে লুটপাট চলে। পণ্যে লেখা থাকে ভ্যাটসহ। ভোক্তা ভ্যাট পরিশোধ করে। ব্যবসায়ী আর আদায়কারীগণের মধ্যে কিঞ্চিৎ দফারফা হয়। যারা ইন্সপেকশন করে তাদের মধ্যেও কিছু তো গলদ দেখা যায়। সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো! নয়ত সেইসব অফিসের কেরানিও কী করে কোটিপতি হয়?
সারা দেশ থেকে যে পরিমান জমির খাজনা সংগৃহীত হওয়ার কথা তা কি হয়? যা হয় তার সবটাও কি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যায়? সর্বত্রই একই চালচিত্র। ফাঁকি দেওয়া, লুটে খাওয়া। ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের ট্যাক্সপেয়ার থেকে শুরু করে বিশাল কোম্পানি পর্যন্ত- অনেকের মাঝেই সরকার তথা রাষ্ট্রকে ফাঁকি দেওয়ার এক প্রচ্ছন্ন প্রবণতা। দেশপ্রেমের প্রবল অভাব চারিদিকে। রাষ্ট্রকে ঠকিয়ে কেউ কেউ জিতে যেতে চায়। যে দায়িত্বশীল কাজের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় বেতন গ্রহণ করে তাদের কারো কারো মধ্যেও রাষ্ট্রীয় অধিকার নয়-ছয় করার প্রবণতা বিপুল। মাঝে মাঝেই মিডিয়ায় এ-সংক্রান্ত বিবরণী বিবৃত হয়। তখন আমাদের বেদনায় হতবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু করণীয় থাকে না। অথচ সরকার কাঠামোতে এসব খতিয়ে দেখার নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ থাকেন। ওই যে, সর্ষের মধ্যেই ভূত!
রাষ্ট্রীয় সকল দফতরে অর্থবছর ভিত্তিতে অডিট পরিচালিত হয়। যারা চোর বা ভুল ধরতে আসে তাদের অনেকেই সেখানে কী-সব করে মিটমাট করে যায়- যদিও তা তো ওপেন সিক্রেট-ই। যেখানে তেমন কোনো অর্থের প্রবাহ নাই সেই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও যদি লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে গলদের দফারফা করে সবকিছু জায়েজ ও আপ টু ডেট করতে হয়, তবে বছর জুড়ে সেথায় কত নাজায়েজ কাজ হয় তা কি আর খোলসা করার দরকার আছে? সব কথা তো বলাও যায় না। সরকারকে এইসব ক্ষেত্রগুলোতে কড়া নজর দিতে হবে। শুধু দুর্নীতি নিম্নমুখী করতে পারলে এই রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রের ইতিবাচক গতি উর্ধ্বমুখী হতে বছরের অপেক্ষা লাগবে না। সপ্তাহান্তে দেশের চিত্র ও চেহারা বদলে যাবে।
ম্যানেজ করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অফিস আদালত পরিচালনায় নীতির ওপর অটল থাকতে হবে। চুরি ধরতে চোর নিয়োগ করা যাবে না। রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি, সেবার গতিহীনতা ঠিক করতে দফতরের মাথাগুলোকে শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনতে পারলে লেজ আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে। একটা প্ল্যানিং ও মনিটরিং বোর্ড করে রাষ্ট্রের কোথায় কোথায় বড় ধরণের লুটপাট হয় সেটা নির্ধারণ করে সেখানে হানা দিতে হবে। দুষ্টচক্রের চেইন ভেঙ্গে দিতে না পারলে সরকারের স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ হবে না। দেশের স্বার্থে, সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার্থে এই কাজটুকু করতেই হবে। বাংলাদেশ দায়িত্বপ্রাপ্ত নাগরিকদের কাছে এটুকু প্রার্থনা করছে।
আমরা, তরুণরা, একটা পরিবর্তিত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, চুরি কিংবা লুটপাটের সুযোগ থাকবে না। অন্যায়কারী দ্রুতই শাস্তির মুখোমুখি হবে। ঘুষখোরের জায়গা হবে জেলে। যারা নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাষ্ট্রকে ঠকায় তাদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাষ্ট্রের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছালে সেটা রাষ্ট্রের কল্যাণেই ব্যয় হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটবে। কাজেই যারা রাষ্ট্রের প্রাপ্য প্রবাহের এই পথে বাঁধার সৃষ্টি করে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করে সোনার বাংলাদেশ, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের বাংলাদেশ এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।