নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
রমজান মানেই রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে ঐতিহ্যের মিলনমেলা। ৪০০ বছরের প্রাচীন এই বাজারটি আবারও সেজেছে তার চেনা রূপে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রমজানের প্রথম দিনেই বাহারি ইফতারের পসরা আর হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চকের অলিগলি। বিক্রেতাদের হাকডাক আর মুখরোচক খাবারের গন্ধে চারপাশ যেন উৎসবের আমেজ ধারণ করেছে।
চকের ঐতিহ্য ও ব্যস্ততা
সরেজমিনে দেখা যায়, আসরের নামাজের আগেই ব্যবসায়ীরা ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেন। কেউ শিকের মাংসে আগুনের আঁচ দিচ্ছেন, কেউবা বড় ট্রেতে সোনালি জিলাপি সাজাচ্ছেন। বিশাল হাঁড়িতে হালিম নাড়া, কাশ্মীরি ও ইরানি শরবতের জৌলুস আর পিয়াজু-বেগুনির ভাজার ম ম গন্ধে মাতোয়ারা পুরো এলাকা। ইফতারের ঠিক আধঘণ্টা আগে ভিড় এতটাই বাড়ে যে, বাজারে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। তবে ইফতারের মিনিট পনেরো আগে ক্রেতারা গন্তব্যে ফিরতে শুরু করায় ভিড় কিছুটা হালকা হয়ে আসে।
তালিকায় শত পদের সমাহার
চকবাজারের ইফতার মানেই খাবারের এক বিশাল সাম্রাজ্য। তালিকায় রয়েছে- আস্ত মুরগির কাবাব, মোরগ মুসাল্লম, বিফ টিকা, চিকেন কাঠি, শামি কাবাব, বটি কাবাব, সুতি কাবাব, কোয়েল ও কবুতরের রোস্ট। মিষ্টি আইটেমের মধ্যে শাহি জিলাপি, নিমকপারা, হালুয়া, দইবড়া এবং লাবাং অন্যতম। তবে আকর্ষণের কেন্দ্রে যথারীতি রয়েছে সেই বিখ্যাত ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। বিক্রেতারা সুর করে শ্লোক আওড়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন: “বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়!”
দরদাম ও বংশপরম্পরার ব্যবসা
ব্যবসায়ী রুবেল জানান, তিনি তার দাদা ও বাবার উত্তরসূরি হিসেবে এই পেশায় আছেন। বর্তমানে তিনি গরুর কাবাব ১০০০ টাকা এবং খাসির কাবাব ৪০০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আরেক বিক্রেতা মোহাম্মদ জুয়েল জানান, ১২টি আইটেম ও ১২টি মসলার সংমিশ্রণে তৈরি ‘বড় বাপের পোলা’ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া খাসির লেগ রোস্ট ৮০০ টাকা এবং দুধমান পরোটা ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের বর্তমান দরদাম একনজরে:
কাবাব ও মাংস: সুতি কাবাব ১০০০ টাকা, খাসির কাবাব ১২০০ টাকা, শিক কাবাব ১২০-১৫০ টাকা, আস্ত মুরগি ২৫০-৩৫০ টাকা, কোয়েল পাখি ৮০ টাকা।
ভাজাপোড়া ও পরোটা: কিমা পরোটা ও ঝাল পরোটা ৬০ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা, আলুচপ ও পিয়াজু ৫-১৫ টাকা।
মিষ্টি ও পানীয়: শাহি জিলাপি ৩৫০ টাকা, ঘিয়ে ভাজা জিলাপি ৩০০ টাকা, জাফরান শরবত ৩০০ টাকা (লিটার), দইবড়া ৩০ টাকা (পিস)।
হালিম: আকারভেদে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা।
ক্রেতাদের অনুভূতি
মগবাজার থেকে আসা ক্রেতা মো. শফিউদ্দিন বলেন, “পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছি। চকের বড় বাপের পোলায় খায় আর খাসির রান না নিলে ইফতারি অপূর্ণ থেকে যায়।” তবে স্থানীয় বাসিন্দা রহমত মিয়াজী কিছুটা আক্ষেপ করে জানান, প্রতি বছর দাম বাড়লেও খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। তবুও ঐতিহ্যের টানেই বারবার ফিরে আসা।
বিক্রেতাদের আশা, রমজানের দিন বাড়ার সাথে সাথে এই ভিড় ও বিক্রি আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।