নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজনৈতিক ডেস্ক॥
ঢাকা: দীর্ঘ ১৮ মাসের সাংগঠনিক স্থবিরতা ও আইনি নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ডিঙিয়ে আবারও রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরদিন থেকেই রাজধানীসহ দেশের অন্তত এক ডজন জেলা ও উপজেলায় ঝটিকা কর্মসূচি পালন করছে দলটির নেতাকর্মীরা। কোথাও দলীয় কার্যালয়ের তালা ভাঙা, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন কিংবা ব্যানার টাঙানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে ‘কৌশলগত মহড়া’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মাঠপর্যায়ের এই তৎপরতা এমন এক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যখন নির্বাচন-পরবর্তী সংবিধান সংস্কার, ‘জুলাই সনদ’ এবং জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি- বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি ‘অদৃশ্য’ ও ‘নীরব’ সমঝোতার গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে।
মাঠে ফেরার ঝটিকা তৎপরতা
প্রতিবেদন করতে গিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের দুই নেতার নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ পটুয়াখালী, বরগুনা, ঠাকুরগাঁও, শরীয়তপুর, বগুড়া, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীরা স্বল্প সময়ের জন্য সমবেত হয়ে স্লোগান ও মোনাজাত করেছেন। এসব কর্মসূচির স্থিরচিত্র ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সংগঠনের প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা চলছে। যদিও অনেক স্থানে বিএনপি বা ছাত্রদল সমর্থিত নেতাকর্মীদের বাধার মুখে এসব কার্যালয় আবারও বন্ধ হয়ে গেছে।
বিএনপির কৌশলী অবস্থান ও নতুন সমীকরণ
আওয়ামী লীগের এই তৎপরতার বিপরীতে বিএনপির হাই কমান্ডের অবস্থান বেশ নমনীয় ও কৌশলী বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ ও ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিনের জামিন পাওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই নতুন সরকারের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠন করার পর বিএনপি অনুভব করছে যে, জামায়াতে ইসলামীসহ কট্টরপন্থী দলগুলোর উত্থান মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি মাঠের বাইরে রাখা হয়তো রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থান প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। দুই দলই এই সনদের কিছু ধারা নিয়ে আপত্তির জায়গায় একমত।
তারেক রহমানের বার্তা ও জয়ের আগ্রহ
নির্বাচনের আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, “জনগণ চাইলে শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন।” এই বক্তব্যকে একটি বৃহত্তর সমঝোতার সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর সজীব ওয়াজেদ জয় আইটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সরকারের প্রথম কর্মদিবসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আওয়ামী লীগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে বলে মন্তব্য করেছেন, যা দলটির বিষয়ে সরকারের ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতির বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্লেষকদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি এ প্রসঙ্গে বলেন, “আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। তবে বিচারের আগে তাদের হঠাৎ রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দিলে তা জামায়াত-এনসিপি এবং তরুণ ভোটাররা সহজভাবে গ্রহণ করবে না। এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।”
আপাতত কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা না থাকলেও, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে জুলাই সনদ ও বিরোধী শিবিরের উত্থান ঠেকাতে একটি নীরব সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা এখন তুঙ্গে।