নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ডেস্ক ॥
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো কেবিনেট’ গঠনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতিটি কী এবং কেন এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল বাড়ছে। মূলত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং বিরোধী দলের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি যাচাইয়ে এটি এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি বেশ পুরনো। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ স্যার রবার্ট পিল যখন তার প্রাক্তন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরোধিতার জন্য একটি দল গঠন করেন, তখন থেকেই এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ১৮৮০-এর দশকে সংবাদপত্রে ‘শ্যাডো কেবিনেট’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং ১৯০৬-১০ সালের দিকে এটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। ১৯২২ সালে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি বিরোধী দল হিসেবে এই ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। তবে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ছায়া মন্ত্রিসভার রূপকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় লেবার নেতা হিউ গেটস্কেলকে, যিনি ১৯৫১ সালে প্রতিটি সরকারি দপ্তরের বিপরীতে একজন নির্দিষ্ট বিরোধী ‘মুখ’ নিযুক্ত করেন।
বৈশ্বিক স্বীকৃতি
বর্তমানে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির দেশগুলোতে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সংসদীয় রীতি। যুক্তরাজ্যে একে “Her Majesty’s Loyal Opposition” বা ‘মহামান্যের অনুগত বিরোধী দল’ বলা হয়। সেখানে বিরোধী দলীয় নেতাকে সরকারিভাবে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় একে বলা হয় “Official Opposition”।
ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?
সহজ কথায়, ছায়া মন্ত্রিসভা হলো প্রধান বিরোধী দল কর্তৃক গঠিত একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা। যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকে, তবে বিরোধী দল তাদের অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করে একটি সমান্তরাল কাঠামো তৈরি করে।
ধরা যাক, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করল। বিপরীতে বিরোধী জোটও তাদের নিজস্ব একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করবে। এটি মূলত ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আগাম প্রস্তুতি। যেমন- এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর যদি সরকার পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না-ও থাকে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধী দলে থেকেই তারা রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল রপ্ত করতে পারে।
যেভাবে কাজ করে এই মন্ত্রিসভা
১. তীব্র নজরদারি: ছায়া মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যের মূল কাজ হলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাজের ওপর কড়া নজর রাখা। যদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী কোনো নতুন নীতি গ্রহণ করেন, তবে ছায়া মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী সেই সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জাতির সামনে তার ভালো-মন্দ তুলে ধরবেন।
২. বিকল্প প্রস্তাবনা: যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্লেষণ করবেন সেই অস্ত্র কেনা কতটুকু যৌক্তিক বা আরও কম দামে কেনা সম্ভব ছিল কি না। কোনো দুর্নীতির সুযোগ থাকলে তারা তাৎক্ষণিক প্রমাণসহ তা জনসমক্ষে আনবেন।
৩. বিকল্প বাজেট: অনেক দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের বাজেটের বিপরীতে একটি নিজস্ব ‘বিকল্প বাজেট’ পেশ করে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করে যে, তারা ক্ষমতায় থাকলে দেশকে আরও উন্নত ও জনবান্ধব বাজেট উপহার দিতে পারত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুফল
বাংলাদেশে যদি অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের প্রস্তাব অনুযায়ী একটি শক্তিশালী ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠিত হয়, তবে তা দেশের রাজনীতির জন্য এক চমৎকার অধ্যায় হবে। এতে সরকার যেমন চাপে থাকবে এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে, তেমনি দেশের নাগরিকরাও সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন। কোনো কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের পতন ঘটলে বিরোধী দল দ্রুত দায়িত্ব বুঝে নিতে পারবে, কারণ তারা আগে থেকেই ‘শ্যাডো কেবিনেট’ হিসেবে দেশের পরিস্থিতির সাথে ওয়াকিবহাল থাকবে।
যদিও এই মন্ত্রিসভা কোনো সরকারি সুবিধা বা সহায়তা পাবে না, তবুও দেশ ও জনগণের স্বার্থে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। ১১-দলীয় জোট যদি বিরোধী দল হিসেবে এমন উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করতে পারে, তবে বাংলাদেশ হয়তো ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও জবাবদিহিমূলক বিরোধী দল পেতে যাচ্ছে।