মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি, ইসলামি ডেস্ক ॥
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় এমন কিছু মহিমান্বিত সময় ও রজনী রয়েছে, যা কেবল সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আধ্যাত্মিকভাবে মানুষের জীবনপ্রবাহকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শাবান মাসের পনেরোতম রজনী, যা আমাদের সমাজে ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত- তেমনি এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাত। এটি একদিকে যেমন মহান আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের প্রতীক, অন্যদিকে আত্মসমালোচনা ও ভাগ্য-সংশোধনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ।
নামের সার্থকতা ও গুরুত্ব
‘বরাত’ শব্দটি মূলত আরবি ‘বারাআহ’ শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ হলো মুক্তি, নিষ্কৃতি বা দায়মুক্তি। পরিভাষায় শবেবরাত হলো গুনাহ থেকে মুক্তি, জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ সুযোগ। যুগ যুগ ধরে মুসলিম মনীষীরা এই রাতকে নৈতিক ও আত্মিক সংস্কারের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে আসছেন।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে ফজিলত
পবিত্র কোরআনের সুরা আদ-দুখানের ৩-৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। সেই রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।” প্রখ্যাত তাবেয়ি ও মুফাসসিরদের মতে, এখানে ‘বরকতময় রাত’ বলতে শাবানের মধ্যরাত তথা শবেবরাতকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাতে সৃষ্টির প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান ও বায়হাকি)। এই হাদিসটির বিশুদ্ধতা নিয়ে ইমাম হাফেজ নূরুদ্দীন হায়সামী (রহ.) এবং আধুনিক যুগের প্রখ্যাত হাদিস গবেষক আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) অত্যন্ত জোরালো ও ইতিবাচক মত দিয়েছেন। মুআয ইবনে জাবাল (রা.)-সহ প্রায় আটজন সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে এই গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে, যা এই রাতের ফজিলতকে ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
আত্মশুদ্ধি ও হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা
শবেবরাতের মূল দর্শন কেবল দীর্ঘ ইবাদত নয়, বরং হৃদয়ের বিশুদ্ধতা অর্জন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী- হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার হলো ক্ষমা লাভের প্রধান অন্তরায়। তাই এই রাত আমাদের আহ্বান জানায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের। এটি মূলত আত্মজিজ্ঞাসার রাত- আমি কেমন মানুষ? আমার উপার্জন কতটা হালাল? আমার আচরণে কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই রয়েছে শবেবরাতের সার্থকতা।
তাকদির ও আমল
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে আগামী এক বছরের জীবন-মৃত্যু, রিজিক ও সুখ-দুঃখের ফয়সালা ফেরেশতাদের কাছে অর্পিত হয়। যদিও চূড়ান্ত তাকদির আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত, তবে দোয়া ও তওবার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করতে পারে। এই রাতের মৌলিক আমল হলো নির্জনে দীর্ঘ ইবাদত, তওবা এবং রোনাজারি করা। এ ছাড়া এই রজনীর পরবর্তী দিনে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
বর্জনীয় লোকাচার
শবেবরাতকে ঘিরে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু প্রথা যেমন- আতশবাজি, আলোকসজ্জা, অতিরিক্ত হইচই কিংবা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতাএগুলোর কোনো ভিত্তি কোরআন-হাদিসে নেই। এসব কর্মকাণ্ড রাতের ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক পরিবেশকে বিনষ্ট করে। ইসলাম আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের পরিবর্তনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
উপসংহার
শবেবরাত কোনো লৌকিক উৎসবের রাত নয়; এটি নীরব আত্মসংস্কারের সময়। গুনাহের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার এবং তাকদিরের দরজায় করুণা ভিক্ষা করার রাত। যদি এই রজনীতে একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে আত্মশুদ্ধির পথে এক কদমও অগ্রসর হতে পারে, তবেই এই শবেবরাত তার জীবনের প্রকৃত ‘মুক্তি’ বা ‘বারাআত’ হিসেবে গণ্য হবে।