আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা॥
আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সেনাদের ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আটলান্টিকের দুই পাড়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। ট্রাম্পের দাবি- যুদ্ধের ময়দানে ন্যাটোর সেনারা সম্মুখসমরে অংশ না নিয়ে ‘পেছনে নিরাপদ দূরত্বে’ অবস্থান করত। তার এই বক্তব্যকে ‘ইতিহাস বিকৃতি’ ও ‘মিত্রদের প্রতি চরম অবমাননা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা।
সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো বলবে তারা আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ অবস্থানে থাকত।” তার এমন মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলছে।
যুক্তরাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। যুদ্ধে নিহত ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, অত্যন্ত নিন্দনীয়। যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের ক্ষতে লবণের ছিটা দিয়েছেন ট্রাম্প।” তিনি আরও যোগ করেন, এমন ভুল তথ্যের জন্য ট্রাম্পের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি নিহত সেনাদের ‘বীর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, আফগান যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারিও এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন বক্তব্য ন্যাটো জোটের ঐক্যকে দুর্বল করে দেবে।
পাল্টা অবস্থানে হোয়াইট হাউস সমালোচনার ঝড় উঠলেও নিজের অবস্থানে অনড় ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এএফপিকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট একদম সঠিক কথা বলেছেন। ন্যাটো জোটের অন্য সব দেশ সম্মিলিতভাবে যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একাই তার চেয়ে বেশি করেছে।” উল্লেখ্য, আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২,৪০০-এর বেশি সেনা নিহত হয়েছেন।
ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় মিত্ররা শুধু যুক্তরাজ্য নয়, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোও ট্রাম্পের বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল এই বক্তব্যকে ‘অসত্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক বলেন, “আফগান যুদ্ধে পোল্যান্ডের ত্যাগ কখনোই ভুলে যাওয়ার নয় এবং তা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।”
ডেনমার্কের পার্লামেন্ট সদস্য রাসমুস জারলভ ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অজ্ঞতাপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জনসংখ্যা অনুপাতে ডেনমার্কই এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সেনা (৪৪ জন) হারিয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সের ৯০ জন এবং কানাডার ১৫০ জনের বেশি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
উত্তেজনা যখন চরমে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের এই ‘অসম্মানজনক’ বক্তব্য মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত করল। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, এই দীর্ঘ যুদ্ধে শুধু আফগান নাগরিকই প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ হাজারের বেশি। এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের আবহে ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর মিত্রদের রক্তক্ষয়ী ত্যাগকে অস্বীকার করার নামান্তর বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।