নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি, রাজনীতি ডেস্ক ॥
ঢাকা: দ্বা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাকযুদ্ধ এবং একে অপরকে ঘায়েল করার প্রবণতা ততটাই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে প্রধান দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মাঠপর্যায়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে পেশিশক্তির ব্যবহার বাড়লে নির্বাচনি সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
পাল্টাপাল্টি তোপ: বিএনপি বনাম জামায়াত ও এনসিপি
নির্বাচনি জনসভাগুলোতে দলীয় প্রধানদের বক্তব্যে এখন আক্রমণাত্মক মেজাজ। সিলেটে ও কিশোরগঞ্জের জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বলেন, “একটি দল ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং মিথ্যা জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে ঠকাচ্ছে। যারা ’৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন মা-বোনদের আইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।”
পাল্টা জবাবে পঞ্চগড় ও গাইবান্ধার জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা বেকার ভাতা নয়, যুবকদের কর্মসংস্থান দিয়ে সম্মানিত করতে চাই। জামায়াতের নেতারা জুলুম সহ্য করেও দেশেই ছিলেন, মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে যাননি।” তার এই মন্তব্য বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি পরোক্ষ কটাক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড আসলে ধোঁকাবাজি। তারা একদিকে কার্ড দেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপি ও লুটেরাদের মনোনয়ন দিচ্ছে। জনগণ এই প্রতারণা বুঝে গেছে।”
ইসি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
নির্বাচনি সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে প্রধান দলগুলোর মধ্যে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন অভিযোগ করেছেন, একটি বিশেষ দল পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে ভোটারদের শপথ করাচ্ছে এবং পোস্টাল ব্যালটে অনিয়ম করছে। একইভাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, মাঠ প্রশাসনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছেন।
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলেন, “বিএনপি ও তারেক রহমান প্রচারের শুরু থেকেই বিধি লঙ্ঘন করছেন। পোস্টার ও মাইক ব্যবহারে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না, অথচ কমিশন নীরব।”
কমিশনের সাফাই ও বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
তবে সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের দাবি, তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং প্রশাসনের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কেউ বিধি ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ওপর কাদা ছোড়াছুড়ি করে আসলে নিজেদের শক্তিমত্তা জাহির করতে চাইছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানুষ আদর্শের চেয়ে পেশিশক্তির রাজনীতিতে বেশি প্রভাবিত হয়। এই প্রবণতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে সহিংসতা বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য কেবল প্রশাসন বা কমিশন নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল আচরণও জরুরি।