নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত গণভোট। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এই গণভোটে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে জনমত যাচাই করা হবে। তবে এই গণভোটকে কেন্দ্র করে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান, বিশেষ করে ‘হ্যাঁ-ভোট’ এর পক্ষে সরকারি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের উপদেষ্টারা জেলায় জেলায় সফর করে জনমত গঠন করছেন এবং সরকারি খরচে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন দপ্তরে একতরফা প্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের অবস্থান ও যুক্তি
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ সরকারের এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা এই সরকারের প্রধানতম ম্যান্ডেট হলো সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত করা। এই সংস্কারের আইনি ভিত্তি দিতেই জুলাই সনদকে গণভোটে জয়যুক্ত করা প্রয়োজন।”
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিষয়টিকে সরকারের ‘কমিটমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আমরা সংস্কারের পক্ষে এবং এটি নিয়ে কোনো ভানভণিতা করছি না। সংবিধান পরিবর্তনের মতো বড় বিষয়ের জন্য আমরা জনগণের কাছে আপিল করছি।” এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে ব্রিটেন (ব্রেক্সিট), স্কটল্যান্ড ও ফ্রান্সের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোটে পক্ষ নিয়ে প্রচারণা চালান, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরই অংশ।
বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের উদ্বেগ
তবে সরকারের এই সক্রিয় প্রচারণাকে ‘নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্র্বর্তী সরকার কোনো ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, এমনটি আগে কখনো দেখিনি। এটি আইন ও নৈতিকতা-উভয় দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য। নাগরিক তার স্বাধীন ইচ্ছায় ভোট দেবেন, সেখানে সরকারের প্ররোচনা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক মনে করেন, সরকারের স্পিরিট হওয়া উচিত অরাজনৈতিক, অথচ এই প্রচারণায় রাজনৈতিক চরিত্র ফুটে উঠছে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “সরকার জনগণের টাকায় (যেখানে না-ভোটের সমর্থকদের টাকাও আছে) একতরফা প্রচারণা চালাচ্ছে। এটি স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন এবং অনৈতিক।”
আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা
আইনজ্ঞরা আরও একটি গভীর সংকটের দিকে আঙুল তুলেছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে থাকে। যারা সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবেন, তারাই আবার গণভোট পরিচালনা করবেন। এমতাবস্থায় সরকার যখন কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ-ভোট’ এর পক্ষে প্রচারের নির্দেশ দেয়, তখন তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি ‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১’-এর পরিপন্থী হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চারটি প্রশ্ন ও জনমনে বিভ্রান্তি
গণভোটে মূলত চারটি বিষয়ের ওপর জনগণের রায় চাওয়া হচ্ছে:
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন প্রক্রিয়া।
২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষের ক্ষমতা।
৩. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব।
৪. রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যান্য সংস্কার প্রতিশ্রুতি।
জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে এই কারণে যে, ভোটারকে এই চারটি ভিন্নধর্মী বিষয়ের ওপর কেবল একটি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ যদি তিনটি বিষয়ে একমত হয়ে একটিতে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে তার ‘না’ বলার সুযোগ কোথায়?
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৬টি দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও বিএনপি ৯টি বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়েছে। আবার জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দল এতে সই করেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে অনেক অসংগতি রয়েছে বলে আগে থেকেই সমালোচনা করে আসছে বিএনপি।
এতসব আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক ভিন্নমত আর নিরপেক্ষতার প্রশ্ন মাথায় নিয়েই দেশ এগোচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে। এখন দেখার বিষয়, এই গণভোট শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় কি না।