আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
ভয়াবহ দাবানলের আগুনে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভিক্টোরিয়া রাজ্যে দাবানল চরম রূপ ধারণ করায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্যোগ পরিস্থিতি’ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ২০১৯-২০২০ সালের প্রলয়ঙ্করী ‘ব্ল্যাক সামার’-এর পর এটিই মহাদেশটির সবচেয়ে বিপজ্জনক অগ্নি-পরিস্থিতি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তীব্র দাবদাহ ও আগুনের লেলিহান শিখা
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে ভিক্টোরিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। গরম ও শুষ্ক বাতাসের কারণে আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। লংউড এলাকার নিকটবর্তী বনাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর (৩ লাখ ৭০ হাজার একর) ভূমি ইতিমধ্যেই আগুনের গ্রাসে হারিয়ে গেছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও জনজীবন
দমকল বাহিনীর প্রাথমিক হিসাব মতে, মেলবোর্নের উত্তরের ছোট শহর রাফিতে অন্তত ২০টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার জাসিন্টা অ্যালান শনিবার দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করে জানিয়েছেন, এই বিশেষ ক্ষমতার বলে দমকল বাহিনী এখন প্রয়োজনে জোরপূর্বক বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারবে। তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন, “যদি আপনাদের এলাকা ছাড়তে বলা হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চলে যান। আমাদের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা।”
নিখোঁজ ও জনদুর্ভোগ
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আগুনের কবলে থাকা একটি অঞ্চল থেকে একটি শিশুসহ তিন জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রিমিয়ার অ্যালান ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদিও শনিবার সকালে আবহাওয়া কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে, তবুও এখনো ৩০টির বেশি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। জনবসতি কম এমন গ্রামীণ এলাকায় আগুনের প্রভাব বেশি হলেও সেখানকার ছোট শহরগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির বিচিত্র আচরণ
লংউড এলাকার কৃষক স্কট পারসেল নিজের অভিজ্ঞতায় জানান, চারদিকে আগুনের ফুলকি উড়ছিল, যা ছিল এক বীভৎস অভিজ্ঞতা। এমনকি ওয়ালওয়া শহরের আগুনের তাপ এতটাই বেশি ছিল যে, সেখানে স্থানীয়ভাবে ‘বজ্রঝড়’ তৈরি হওয়ার মতো বিরল ঘটনা ঘটেছে।
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিপর্যয়
তীব্র গরমে শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুলও চরম সংকটে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় অসহনীয় তাপে শত শত বাদুড়ের বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে বলে বন্যপ্রাণী সংগঠনগুলো নিশ্চিত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্য থেকে কয়েক শ’ দমকল কর্মী বর্তমানে ভিক্টোরিয়ায় আগুন নেভানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
গবেষকদের মতে, ১৯১০ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার গড় তাপমাত্রা ১.৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, একদিকে অস্ট্রেলিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে তারা বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি (গ্যাস ও কয়লা) রপ্তানিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে।