নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি, শিক্ষা ডেস্ক ॥
ঢাকা: আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরের অপশাসন, ভোট চুরির ইতিহাস এবং ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের বীরত্বগাথা স্থান পেয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে পাঠ্যপুস্তকে এই আমূল পরিবর্তন এনেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। গত ১ জানুয়ারি সারাদেশে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া বইগুলোতে শেখ হাসিনা আমলের ‘চোরতন্ত্র’ ও ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ভোট জালিয়াতি ও দুঃশাসনের চিত্র
নবম ও দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ পাঠে শেখ হাসিনা সরকারকে ‘নিপীড়ক শাসক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষায় কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেন। এর ফলে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘নাইট ভোট’ বা আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির প্রহসন এবং ২০২৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা করা হয়। ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার যে ‘নীলনকশা’ আওয়ামী লীগ করেছিল, জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচার ও চোরতন্ত্র
পাঠ্যবইয়ে শেখ হাসিনার শাসনকালকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এই সময়ের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। গত ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ‘চোরতন্ত্র’ কায়েম করে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল।
বাকশাল ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা রোধ
স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল। বর্তমান পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপনের পরিবর্তে ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব ও আবু সাঈদের আত্মত্যাগ
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহ বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে সচিত্র স্থান পেয়েছে। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ আবু সাঈদের বীরত্ব এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সরকারি বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে যে, শাসক যত শক্তিশালীই হোক না কেন, গণপ্রতিরোধের মুখে তার পরাজয় অনিবার্য। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ফ্যাসিবাদের পতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্রে প্রতিবাদ
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘চারুপাঠ’ বইয়ে ‘কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টারের ভাষা’ শিরোনামে একটি বিশেষ পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে কার্টুনের মাধ্যমে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার দৃশ্যসহ আন্দোলনের বিভিন্ন প্রতিবাদী চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এনসিটিবি-র বক্তব্য
এনসিটিবি-র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত আওয়ামী আমলে পাঠ্যবইয়ে অনেক অযাচিত ও অতিরঞ্জিত তথ্য ছিল। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তে এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) পরামর্শে সেসব বাদ দিয়ে সত্য ইতিহাস ও জুলাই আন্দোলনের বীরত্বগাথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবি-র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, “সরকারের নির্দেশনা ও বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতের ভিত্তিতেই পাঠ্যবইয়ে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা দেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।”