মোঃ মিরন খন্দকার॥
বর্তমান বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ একটি আলোচিত বিষয়। ইসলামে নারীর রাজনৈতিক ভূমিকা বা নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক থাকলেও ইসলামের মূল উৎস-কুরআন, হাদিস এবং ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের অন্যতম অংশীদার হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।
কুরআনের আলোকে নারীর রাজনৈতিক ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে নারীর নেতৃত্বকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং বেশ কিছু আয়াতে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
রানী বিলকিসের উদাহরণ: সূরা আন-নামলে সাবা রাজ্যের রানী বিলকিসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন তাকে একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্ত এবং পরামর্শভিত্তিক (Consultative) শাসন পরিচালনাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। তার সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তার জাতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে।
পারস্পরিক অভিভাবকত্ব: সূরা তাওবার ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু (আউলিয়া)। তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে।” এখানে ‘আউলিয়া’ শব্দটির একটি অর্থ হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে একে অপরের সহযোগী হওয়া।
রাজনৈতিক আনুগত্য বা বায়াত: সূরা মুমতাহিনার ১২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, তৎকালীন নারীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে ‘বায়াত’ বা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আনুগত্যের শপথ নিতেন। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় স্বীকৃতি ছিল।
হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা
নারীর নেতৃত্বের বিপক্ষে সাধারণত সহীহ বুখারীর একটি হাদিস (নং ৪৪২৫) উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে পারস্য সম্রাট কিসরার কন্যার সিংহাসনে আরোহণের প্রেক্ষাপটে রাসুল (সা.) বলেছিলেন-“সে জাতি সফল হবে না, যারা তাদের পরিচালনার দায়িত্ব নারীর হাতে ন্যস্ত করে।”
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমদের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে:
১. সনাতনপন্থী মত: ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিঈসহ অধিকাংশ ফকীহ মনে করেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ (খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান) হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া আবশ্যক।
২. আধুনিক ও গবেষণামূলক মত: আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভীসহ অনেক আধুনিক গবেষক মনে করেন, এই হাদিসটি তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল। এটি সাধারণ বা স্থায়ী কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। বর্তমান যুগে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাধা নয়।
ইসলামের ইতিহাসে নারীর অনন্য ভূমিকা
ইসলামের স্বর্ণযুগে নারীরা কেবল গৃহকোণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং বড় বড় নীতিনির্ধারণী বিষয়েও ভূমিকা রেখেছেন।
হযরত আয়েশা (রা.): তিনি জঙ্গে জামাল বা উটের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রমাণ দেয়।
হযরত উম্মে সালামাহ (রা.): হুদায়বিয়ার সন্ধির সংকটকালীন মুহূর্তে তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরামর্শ পুরো মুসলিম উম্মাহকে বিপদমুক্ত করেছিল।
শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.): খলিফা হযরত উমর (রা.) তাকে মদীনার বাজারের তদারকি বা ‘মার্কেট ইন্সপেক্টর’ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন, যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বিচারিক পদ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ওলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত
আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ এখন নারীর সক্রিয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক ভূমিকাকে সমর্থন করছেন। বর্তমান সময়ের মূল সিদ্ধান্তগুলো হলো:
নীতি নির্ধারণ: নারীরা সংসদ সদস্য বা মজলিসে শুরার সদস্য হয়ে রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ভোটাধিকার: ইসলামে নারীদের ভোট দেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যা একটি সাক্ষ্য বা আমানত হিসেবে গণ্য।
বিচারের দায়িত্ব: ইমাম আবু হানিফার মতে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারীরা বিচারক (Judge) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ বা খিলাফত নিয়ে মতভেদ থাকলেও, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা প্রশাসনিক পদে নারীর অংশগ্রহণকে অনেক বড় বড় ইসলামী বিশেষজ্ঞ বৈধ ও প্রয়োজনীয় মনে করেন। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, কর্মক্ষেত্রে শালীনতা ও ইসলামী পর্দার বিধান বজায় রেখে জাতীয় ও সামাজিক কল্যাণে অবদান রাখা।