নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা॥
তারিখ: ০২ জানুয়ারি, ২০২৬; রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশের ব্যস্ত রাস্তা। প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও ফুটপাতের এক কোণায় পলিথিন বিছিয়ে বসেছিলেন ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর, মাথায় পক্ক কেশ, আর চোখে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি। এই বয়সে যখন বিশ্রামে থাকার কথা, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি বিক্রি করছিলেন সামান্য চানাচুর আর মুড়ি। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে তার প্রতিদিনের আহার আর আগামীকালের বাজার।
কিন্তু গতকাল বিকেলের এক নির্মম দৃশ্য নাড়িয়ে দিয়েছে পথচারীদের বিবেককে, যদিও প্রতিবাদের ভাষা হারিয়েছে জনাকীর্ণ এই শহর।
১০০ টাকার জন্য নির্মমতা
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিকেলে তথাকথিত ‘চাঁদাবাজ’ পরিচয়ধারী দুই ব্যক্তি বৃদ্ধের সামনে এসে দাঁড়ায়। কর্কশ স্বরে তাদের দাবি-“আজকের ১০০ টাকা চাঁদা কই?”
বৃদ্ধ অত্যন্ত শান্ত গলায় ও অসহায়ভাবে মিনতি করে বলেছিলেন, “বাবা, আজ সকাল থেকে তেমন বিক্রি হয়নি। বিকেলটা যেতে দাও, কিছু টাকা জমলে দেব।” কিন্তু এই সাধারণ অনুরোধটুকু সহ্য হয়নি দম্ভে মদমত্ত ওই যুবকদের। মুহূর্তের মধ্যেই একজন লাথি মেরে বৃদ্ধের সাজানো দোকানটি উল্টে দেয়। মুহূর্তেই চানাচুর, মুড়ি আর মশলা ধুলোয় মিশে যায়।
নীরব দর্শক ও এক বৃদ্ধের অশ্রু
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় ছিল আশপাশের মানুষের ভূমিকা। যখন সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ অসহায়ভাবে নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া রুটিরুজি রাস্তার ধুলোবালি থেকে কুড়াচ্ছিলেন, তখন কেউ কেউ স্মার্টফোনে ভিডিও করতে ব্যস্ত ছিলেন, কেউবা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। কেউ এগিয়ে এসে বলেননি-“থামুন, একজন বৃদ্ধের ওপর এই জুলুম বন্ধ করুন।”
চোখের জল মুছতে মুছতে বৃদ্ধ বলেন, “বাবা, আজকের খাওয়া আর কালকের বাজার—সবই তো এই পলিথিনের ওপর সাজানো ছিল। এখন আমি বাড়ি ফিরব কী নিয়ে?” তার প্রতিটি মুঠোয় তখন শুধু ছড়িয়ে থাকা চানাচুর ছিল না, ছিল আজন্ম লালিত আত্মসম্মান আর সীমাহীন অসহায়ত্ব।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন
এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ চাঁদাবাজির গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত প্রতিফলন। অশান্তি কেবল অস্ত্র দিয়ে আসে না, অশান্তি আসে এমন জুলুম আর অবিচার থেকে। যে সমাজে একজন বৃদ্ধকে ১০০ টাকার জন্য রাস্তায় বসে কাঁদতে হয়, সেখানে আইনের শাসনের পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চা আজ বড় বেশি প্রয়োজন।
সমাধানের পথ কোথায়?
দেশের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সত্যিকারের শান্তি আনতে হলে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
এর জন্য প্রয়োজন:
জুলুমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান: দুর্বলকে রক্ষা করার মতো শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা।
নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্ব: যারা ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করবে।
ইসলামী ও মানবিক মূল্যবোধ: শাসনব্যবস্থায় ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটলে মানুষের ওপর মানুষের এমন অত্যাচার বন্ধ করা সম্ভব।
কমলাপুরের রাস্তার ধুলোয় মিশে যাওয়া সেই বৃদ্ধের স্বপ্ন আর চোখের পানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-শান্তি কেবল শব্দে নয়, শান্তি আসে ন্যায়বিচার আর মানবতার হাত ধরে।