নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
১০ মার্চ ২০১৯ সালের এক বিভীষিকাময় রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এক সন্তান, যার মা তখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ধীরে ধীরে মায়ের একাধিক অঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়া, জীবনের শেষ মুহূর্তের ইঙ্গিত, এবং সেই সময়ে তার ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। একইসঙ্গে, বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় থাকা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তার জন্য দোয়া প্রকাশ করেছেন এই লেখক।
মায়ের শেষ প্রহর:
লেখক জানিয়েছেন, ১০ মার্চ ২০১৯, রাত বারোটার পর কর্তব্যরত ডাক্তার জানান যে তার মায়ের একটির পর একটি অঙ্গ অকেজো হতে শুরু করেছে। দিনের বেলায় ICU-এর দায়িত্বে থাকা ডাক্তার কফির মগ হাতে পুরো পরিস্থিতি বর্ণনা করেছিলেন। লেখক জানান, তিনি শান্তভাবে সব শুনেছিলেন এবং এক ফোঁটাও কাঁদেননি। ডাক্তার শেষ কথায় নিরাশ না হতে বললেও, লেখকের মন তখন বুঝতে পারছিল যে কোনো ‘মিরাকল’ ঘটবে না।
ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে তিনি মায়ের কাছে যান। নানান যন্ত্রপাতির ভিড়ে মাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। মা তখন বেডের সাথে হাত বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। তার সেই শক্তি ছিল না যে টান মেরে যন্ত্রপাতি খুলে ফেলবেন-এই অনুরোধ জানিয়ে ডাক্তারকে হাত খুলে দিতে বলেন তিনি।
লেখক জানান, তিনি মায়ের হাত ধরে বসেছিলেন। একসময় খেয়াল করলেন, মায়ের শরীরে অঙ্গগুলো অকেজ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।
ভয়াবহ রাত:
সেদিন রাতে এক ভয়ংকর ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। হাসপাতালের ভেতরে দমবন্ধ লাগায় তিনি বাইরের ফাঁকা জায়গায়, টিন শেড ওয়েটিং রুমের বেঞ্চে বসে একা একা বৃষ্টি দেখেন।
রাত পেরোলে ঝড়-বৃষ্টি থামে। বীথি দি এসে ইব্রাহীম কার্ডিয়াকের ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে তাকে খাওয়ান। তার আগে শেষ মনে হয় ICU-এর সেই কফিটাই খেয়েছিলেন। এরপর বীথি দি তাকে নীলার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে গোসল করে ঘুমানোর চেষ্টা করেন এবং নীলার বাসা থেকে বের হওয়ার সময় খালাম্মার দেওয়া ভাতও খান।
শেষ অপেক্ষার প্রহর:
তিনি বুঝতে পারছিলেন যে দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু এই গভীর অনুভূতি তিনি কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারছিলেন না। একে একে বন্ধু ও স্বজনরা হাসপাতালে এসে তার পাশে দাঁড়ান।
১১ তারিখ সন্ধ্যায় ডাক্তার ভাই ও লেখককে ICU-তে ডাকেন, সাথে ছিলেন কৃষ্ণকলি দি। তিনি দেখতে পান মায়ের শরীর ফুলে গেছে এবং মায়ের শরীরের গন্ধও চিনতে পারছিলেন না। তার ভাই ডুকরে কেঁদে ওঠেন। কৃষ্ণকলি দি ডাক্তারের সাথে কথা বলেন। তখনো লেখক ক্লিনিক্যালি ডেড-এর অর্থ পুরোপুরি জানতেন না।
লেখক জানান, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যারা যান, তাদের কথা জানলে তার ঘুম আসে না। সেই স্মৃতিগুলো এমনভাবে ফিরে আসে যেন গতকালের ঘটনা। তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি চলে যাচ্ছে, হাত ধরে বসে থেকেও তাকে আটকে রাখা যাচ্ছে না, যেন তার চলে যাওয়ার জেদ।
বেগম জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা:
লেখকের এই ব্যক্তিগত বেদনাবোধের সূত্র ধরে তিনি বর্তমান গুরুতর অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মন থেকে দোয়া করেছেন যেন তার কষ্টের উপশম হয়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু না এবং তিনি কোনো রাজনৈতিক দলও করেন না। তবে এই ভদ্রমহিলার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে।
তিনি মন্তব্য করেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘ঐরকম ভৌতিক পরিবেশে’ খালেদা জিয়ার কারাবন্দী থাকাটা চূড়ান্ত অপমানজনক এবং অমানবিক ছিল। তারপরও তিনি অসীম ধৈর্য দেখিয়েছেন এবং এক ফোঁটাও আপোষ করেননি। তার সাজ-পোশাক, শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর ট্রল হলেও তাকে কখনো এ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়নি।
লেখক মনে করেন, গত দেড় বছরে তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় নিয়ে কোনো গলাবাজি বা প্রতিহিংসাপরায়ণ শব্দ উচ্চারণ না করেও তিনি চুপ থেকে বুঝিয়ে দিয়েছেন ‘সবর’ (ধৈর্য) কাকে বলে।
তিনি বলেন, “আল্লাহ যাকে যেভাবে সম্মান দেবেন বলে নির্ধারণ করেন, তাঁকে তিনি সেভাবেই যে দেন তা খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে দেখলাম। উনি স্বল্প শিক্ষিত হয়েও জীবন দিয়ে এমন সভ্য আচরণের মাধ্যমে জীবনের শেষ প্রান্তে নতুন এক শিক্ষা দিয়ে গেলেন। শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা এভাবেই হয়তো অর্জন করে বিদায় নিতে হয়।”