নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা ॥
এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশে মোট সাতটি এবং রাজধানী ঢাকায় পাঁচবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে সতর্কতা জরুরি হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে ২১ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত। মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ২১ নভেম্বর ও তার পরদিন শনিবার ঢাকা ও এর আশপাশে চারবার ভূমিকম্প হয়। এছাড়া, ২৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ২৭ নভেম্বর বিকাল পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টার মধ্যে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটি ঢাকায় ছিল।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: জমে আছে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তি
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা এই মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, যেহেতু দেশে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি, তাই ভূমিতে বিশাল আকারের শক্তি জমে আছে। এই জমে থাকা শক্তিকেই তাঁরা বড় ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি শক্তি বিবেচনায় মাঝারি হলেও এটিকে শক্তিশালী ধরা যায়। শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এক থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ছোট ছোট ভূমিকম্প বা ‘আফটার শক’ অনুভূত হতে পারে। তবে, তাঁরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কাও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। এজন্য ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশবাসীকে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে, এর বেশির ভাগই একই স্থান থেকে উৎপত্তি হয়েছে। গত ২১, ২২ এবং ২৭ নভেম্বরের ভূমিকম্প একই এলাকায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারের ব্যবধানে হয়েছে।”
অধ্যাপক আখতারের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া এই ভূমিকম্পগুলো বার্তা দিচ্ছে যে, এই সাবডাকশন জোনে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে। তিনি জানান, “আমরা পরিমাপ করেছি, ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তি এখানে জমা হয়ে আছে। এই শক্তি আজ বা আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বের হবেই। যত দেরি হবে, তত ভয়াবহ আকারের ভূমিকম্প হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে দুটো প্লেট সামান্য ‘আনলকড’ হয়ে সামান্য কিছু শক্তি বের করেছে, তবে তা পুরো জমে থাকা শক্তির দশমিক ১ শতাংশও নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী নিশ্চিত করেন, ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর যে কম্পনগুলো হয়েছে, সেগুলো সবই ‘আফটার শক’। তবে তিনি ভূমিকম্প মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
নগরবাসীর জন্য সতর্কতা ও প্রস্তুতির পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা নগরবাসীকে ভূমিকম্পের সময় বাইরে বের না হয়ে বরং দুই-এক কদমের ভিতরে যে যেখানে থাকবেন, তার মধ্যেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছেন।
ভূমিকম্প মোকাবিলা এবং পরবর্তী দায়িত্ব পালনের জন্য দ্রুত উদ্যোগ হিসেবে তারা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন:
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একটি ন্যাচারাল ডিজাস্টার গেম তৈরি করা যেতে পারে।
ওয়ার্ডভিত্তিক উচ্চ ও মাঝারি ঝুঁকির ভবনগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
যে ভবনগুলো রেট্রোফিটিং (ভূমিকম্প সহনশীল করার কাজ) করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত করতে হবে।
এক সপ্তাহে ৭ ভূমিকম্পের সংক্ষিপ্ত চিত্র
২৭ নভেম্বর বিকাল ৪টা ১৫ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে: ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ৩.৬ মাত্রার ভূমিকম্প। উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর ঘোড়াশালে।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) দিবাগত রাত ৩টা ২৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে: বঙ্গোপসাগরে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প। ভূপৃষ্ঠ থেকে গভীরতা মাত্র ১০ কিলোমিটার।
রাত ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে: সিলেটে ৩.৪ মাত্রার ভূমিকম্প। উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুরে।
২২ নভেম্বর: রাজধানী ঢাকায় তিনবার ভূমিকম্প।
সকালে নরসিংদীর পলাশে ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্প।
সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে রাজধানী বাড্ডায় অনুভূত হয় ৩.৭ মাত্রার ভূকম্পন।
এর ঠিক ১ সেকেন্ড আগে সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে নরসিংদীতে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
২১ নভেম্বর সকালে: অনুভূত হয় ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে দেশে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ৬ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।