লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল ॥
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার বিষয়টি আজ দেশের উন্নয়নের জন্য এক অপরিহার্য শর্ত। সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে এক নিত্যনৈমিত্তিক ও ভয়াবহ সমস্যা, যা কেবল জানমালের ক্ষয়ক্ষতিই ঘটাচ্ছে না, দেশের অর্থনীতি এবং মানবসম্পদের ওপরও ফেলছে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমবর্ধমান।
জাতীয় সমস্যা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
সড়ক দুর্ঘটনারোধে ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ ৩২ বছর ধরে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভাবে পালন করা হয়। এ বছর, নবমবারের মতো পালিত দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, “মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি”।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্যমতে, গত দুই দশকে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫৬ হাজার ৯৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা প্রতিদিন গড়ে ৮ জনের প্রাণহানি। এআরআই আরও জানিয়েছে, ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য চালকরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনা ও এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) দুই থেকে তিন শতাংশ।
এছাড়াও, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত রোগীদের পেছনে ব্যয় হয়। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ কমবে এবং হাসপাতালের সেবার মানও বাড়ানো সম্ভব হবে।
দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো গবেষণায় উঠে এসেছে:
চালককেন্দ্রিক: চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং-এর প্রবণতা, মাদকসেবন করে বা ভুল পথে গাড়ি চালানো, এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতার অভাব।
যানবাহন ও অবকাঠামো: ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, অনেক সড়ক-মহাসড়ক পরিকল্পনাহীনভাবে নির্মাণ, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা।
ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক আইন: দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিকব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন না মানা, নির্দিষ্ট লেন ধরে না চালিয়ে সড়কের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, ফুটপাত ও রাস্তার ওপর অবৈধ দোকানপাট ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং।
জনসচেতনতা ও অনীহা: মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার না করা, ফুটপাত বা ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে পথচারীদের চলাচল এবং রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে যাত্রীদের অনীহা।
উত্তরণের পথ ও করণীয়
বুয়েটের এআরআই গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়; ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি: পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করে চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। নিয়মিত বিরতিতে ডোপ টেস্ট নিশ্চিত করা এবং গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা।
গতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার: মহাসড়কগুলোতে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রণয়ন। গতি পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক স্পিড ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় গতি পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করা।
ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়: সড়কে শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দ্রুত দূর করা। দুর্ঘটনা রোধে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা।
আইনের প্রয়োগ: শুধু চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া নিশ্চিত করা। সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং নিরপেক্ষভাবে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা।
জনসচেতনতা: ট্রাফিক আইন সম্পর্কে চালকসহ সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা এবং জনগণকে ট্রাফিক আইন ও রাস্তায় নিরাপদে চলাচলের নিয়ম যথাযথভাবে মেনে চলার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা।
উপসংহার
সড়ক দুর্ঘটনা মানবসম্পদের বিনাশ ঘটাচ্ছে এবং দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদী অমানবিক কষ্টের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বলা হলেও এই খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে বেগবান করতে এবং সড়ককে মৃত্যুফাঁদ হওয়া থেকে বাঁচাতে সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা, সদিচ্ছা এবং সমন্বিত পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।