অনলাইন ডেস্ক ॥
বাউল, বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অত্যন্ত পরিচিত নাম। তাদের সুর, গান এবং জীবনযাত্রা বহু শতাব্দী ধরে এদেশের মানুষকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু বাউলদের ধর্মতত্ত্ব ও সাধন পদ্ধতির ভেতরের জগৎটি গবেষকদের চোখে এক ভিন্ন এবং বিতর্কিত ছবি তুলে ধরে। গবেষক ও পন্ডিতদের বিভিন্ন বইয়ে বাউল মতবাদ নিয়ে যে গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, তা সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা।
ড. আনোয়ারুল করিম তাঁর ‘বাংলাদেশের বাউল’ গ্রন্থে বাউল শব্দের উৎপত্তি নিয়ে দু’টি প্রচলিত মত তুলে ধরেছেন:
১. বাল থেকে বাউল: তিনি উল্লেখ করেছেন যে বাউল শব্দটি এসেছে প্রাচীন দেবতা ‘বাল’ থেকে, যার পূজা কোরআন ও বাইবেলে নিষিদ্ধ। তাঁর মতে, এটি ছিল প্রাচীন যৌনতার দেবতা এবং কিছু বাউল এখনও এর পূজা করে।
২. বাতুল থেকে বাউল: ‘বাতুল’ শব্দের অর্থ পাগল। সমাজে যারা ‘পাগল’ হিসেবে পরিচিত, তাদেরই বাউল বলা হয়।
আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ বর্জন
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাউলরা আনুষ্ঠানিক ধর্ম পালনে বিশ্বাসী নন। তারা কোনো মসজিদ বা মন্দিরে যান না এবং কোনো আসমানী ধর্মগ্রন্থে তাদের আস্থা নেই। তাদের দর্শন হলো দেহকেন্দ্রিক। বাউলরা মনে করেন, দেহই হলো পরম সম্পদ এবং সৃষ্টিকর্তা দেহের মধ্যেই অবস্থান করেন।
সাধন পদ্ধতি: মিথুনাত্মক যোগ ও প্রতীকী ভাষা
গবেষকদের মতে, বাউল সাধন পদ্ধতির মূল ভিত্তি অত্যন্ত বিতর্কিত। ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘বাউল তত্ত্ব’ বইয়ে স্পষ্ট লিখেছেন, “কামাচার বা মিথুনাত্মক যোগ সাধনাই হলো বাউল পদ্ধতি।”
এই সাধনার জন্য একজন পুরুষের সাথে একজন নারীর (যা ‘প্রকৃতি’ নামে পরিচিত) সহাবস্থান জরুরি। গবেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে বিবাহবন্ধন আবশ্যিক নয়। অন্যের স্ত্রীকেও সাধনার সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ এবং পরকীয়া তাদের ধর্মে বৈধ। এছাড়াও, গাঁজা পান করা তাদের সাধনার একটি বৈধ অংশ।
বাউলরা তাদের সাধন পদ্ধতির এই দিকটি বোঝানোর জন্য প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘গভীর নির্জন পথে’ বইয়ে এই প্রতীকী ভাষার কিছু উদাহরণ দিয়েছেন, যা চমকপ্রদ:
অমাবস্যা = নারীর ঋতুকাল
বাঁকা নদী = নারীর যৌনী
কুমারী = কাম
লতা = সন্তান
চন্দ্র সাধন = মলমূত্র পান
নেয়ামত আলী তাঁর ‘লালন পরিভাষা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “বীজ, কৃষি, মিন, সাধন—সব শব্দ যৌনকর্মের বিভিন্ন মুহূর্তকে বোঝায়।”
গানের নিহিতার্থ
বাউল গানকে অনেকেই আধ্যাত্মিক মনে করলেও গবেষকরা এর ভিন্ন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন।
‘সময় গেলে সাধন হবে না’: গবেষকদের মতে, এই গানটি আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে ঋতুস্রাবের আগের সময়ে অবৈধ যৌনাচার করার ইঙ্গিত দেয়।
‘বাড়ির পাশে আরশি নগর’: এই গানটিও নিছক যৌনতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে বলে গবেষকরা মনে করেন। (সূত্র: বাংলাদেশের বাউল)
‘প্রেম ভাজা’ ও বিতর্কিত বিশ্বাস
বাউলদের কিছু বিশ্বাস ও অনুশীলন অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং বিতর্কিত। ‘বাংলাদেশের বাউল’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী:
তারা বিশ্বাস করে, রোগ সারানোর জন্য নারীর ‘রজ’ পান করতে হবে। ‘রজ’ বলতে কুমারীর প্রথম মাসিকের রক্ত, অথবা নারীর যৌন উত্তেজনার সময় নির্গত পদার্থকে বোঝানো হয়।
তারা মনে করে, স্তনের দুধ পান করলে রোগ ভালো হয়।
তাদের মতে, “সর্ব রোগের মহৌষধ” হলো— মল, মূত্র, রজ ও বীর্য মিশিয়ে তৈরিকৃত ‘প্রেম ভাজা’ খাওয়া।
লালন শাহ: ‘বাংলার নবী’?
বাউলদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও ভিন্নমত দেখা যায়। কোরআন সম্পর্কে তাদের বক্তব্য, “একেক যুগে একেক কালাম এসেছে, একটাতে হালাল, আরেকটাতে হারাম। তাহলে সব মানুষের লেখা।”
সুধীর চক্রবর্তীর ‘ব্রাত্ত লোকায়তন’ অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে লালনের আখড়ায় কোরআনখানি চালু হলে বাউলরা প্রতিবাদ করে। তারা তাদের নিজস্ব কালিমা ঘোষণা করে: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ লালন রাসুলুল্লাহ।”
এছাড়াও, কিছু বাউল প্রকাশ্যে “লালন বাংলার নবী” বলে দাবি করে থাকেন।
বাউলদের এই তত্ত্ব ও সাধন পদ্ধতিগুলো গবেষকদের বই থেকেই সংগৃহীত। লোকায়ত সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব অনস্বীকার্য, কিন্তু তাদের ভেতরের দর্শন অনেক ক্ষেত্রেই সমাজ ও মূলধারার ধর্মীয় রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
সূত্র: ড. আহমদ শরীফের ‘বাউল তত্ত্ব’, ড. আনোয়ারুল করিমের ‘বাংলাদেশের বাউল’, সুধীর চক্রবর্তীর ‘গভীর নির্জন পথে’ ও ‘ব্রাত্ত লোকায়তন’, এবং নেয়ামত আলীর ‘লালন পরিভাষা’