মালু পাড়ার মেয়ে পারু : তৃতীয় পর্ব
লেখক: আসাম্বর ॥
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে নিখোঁজ থাকা পারুর সন্ধান না মেলায় স্থানীয় হরিণা বাগবাটি ও ধানগাড়া চান্দাইকোনা এলাকায় উদ্বেগ ছিল তুঙ্গে। নিখোঁজ বার্তা প্রথমে ছাপানো হলেও, পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় অবশেষে পারুর খবর টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়। কিন্তু পারু ততদিনে পাড়ি দিয়েছেন আরও বহুদূর-পার্শ্ববর্তী এক জেলার নির্জন পল্লী গ্রামে।
ঠিকানা বদলেছে, বদলায়নি দুরাবস্থা
পরিচিত পরিজনদের কাছ থেকে বহু দূরে এসে পারু তখন এক কঙ্কালসার পাগলী। নতুন গ্রামের কেউ তাকে চেনে না। সারাদিন এই দুয়ারে-ওই দুয়ারে ঘুরে বেড়ান তিনি, কখনো একবেলা খেয়ে, কখনো বা না খেয়েই। পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের ঢিল ছোড়া ও নানা কটূক্তিই যেন তার বিনোদন। একসময়ের উজ্জ্বল সোনার মতো চেহারা ধুলায় মিশে গেছে। পারুর মুখে শুধু একটাই অস্পষ্ট জিজ্ঞাসা শোনা যেত, “নুর সাহেবের বাড়ি কোথায়?” কে এই নুর সাহেব, তা কেউই জানতে পারত না। মাঝে মাঝে তার আবছা মনে পড়ত নুর সাহেবের গ্রামের নাম, বাবার নাম, এমনকি অসুস্থ অবস্থায় নুর সাহেবের মায়ের সঙ্গেও তার কথা হয়েছিল।
ক্ষুধাতুর পারুকে আশ্রয় দিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মা
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পারু একদিন এক সম্ভ্রান্ত বড় বাড়ির উঠানে গিয়ে হাজির হন। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে তিনি দু-নলা ভাতের জন্য হাত পাতেন। বাড়ির এক মধ্যবয়সী মহিলা (যিনি নুর সাহেবের মা) এগিয়ে আসেন। পারুর কাছে তার কণ্ঠস্বর বেশ পরিচিত মনে হয়। স্নেহবশত মহিলাটি তাকে ঘরের এক কোণে খাবার খেতে দেন।
খাবার টেবিলে পারুর চোখ যায় দেওয়ালে সযত্নে টাঙানো নুর সাহেবের রঙিন বাঁধানো ছবির দিকে। পারু অপলকভাবে সেটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। নুর সাহেবের মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কিরে পাগলী, ছবিটার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? তুই কি কখনো তারে দেখেছিস?” পারু শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানান।
ছবি দেখে নিশ্চিত হলেন পিএইচডি ড. নুর সাহেব
ঠিক সেই সময় বিদেশে কর্মরত নুর সাহেব তার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। মা তাকে সব ঘটনা খুলে বলেন-কীভাবে একজন পাগলী তার ছবি দেখে বারবার তাকিয়ে আছে। নুর সাহেব আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন এবং মাকে অনুরোধ করেন পারুর একটি ছবি তুলে পাঠাতে, যাতে তিনি তাকে চিনতে পারেন।
কাপড়-চোপড়ে ময়লা আর দুর্গন্ধ থাকা সত্ত্বেও নুর সাহেবের মা ছেলের অনুরোধে ছবিটি তুলে পাঠান। ছবিটি দেখেই নুর সাহেব আর চিনতে ভুল করেন না। তিনি বিস্মিত হয়ে মাকে বলেন, “আল্লাহর কী লীলাখেলা! মা, এই সেই মেয়ে! যাকে প্রায় মৃত অবস্থায় বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল থেকে উদ্ধার করে সুস্থ করে আমি বাবা-মায়ের কাছে রেখে এসেছিলাম। সে আমার কাছে থাকা অবস্থায় আপনিও তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আপনিই তো তাকে আমার বউ করে ঘরে আনতে বলছিলেন!”
সুস্থতার পর ধর্মান্তরের বাধা
নুর সাহেব জানতে পারেন পারু হিন্দু ধর্মের ছোট জাত হওয়ায়, তার মা পারু সুস্থ হলেও তাকে নুরের ছবিতে হাত দিতে বা তাকে পুত্রবধূ করতে রাজি নন। পারুর এই দুরবস্থা এবং সুস্থতার পেছনে ধর্মীয় গোঁড়ামি একটি কারণ বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
প্রায় দেড় বছর পর পারু স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে পান। নুর সাহেব তার মাকে নির্দেশ দেন পারুকে জোর করে কোথাও যেতে না দিতে এবং ভালো ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ করার পর যেন তার “স্বার্থপর বাবা-মায়ের” কাছে ফেরত দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, এই মেয়ের জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছেন, চোখের জল ফেলেছেন এবং আশঙ্কা করেন-কোনো এক পাপের কারণে সে এমন পাগল হয়েছিল।
সুস্থ হওয়ার পর নুর সাহেব পারুর মাকে পত্র লেখেন। পারুর মা-বাবা সেখানে গিয়ে দেখেন, নুর সাহেবের পরিবার অনেক ধনী, উচ্চ শিক্ষিত এবং সবাই বিদেশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। নুর সাহেব নিজে একজন পিএইচডি ড. এবং আমেরিকার সরকারের নিয়োগকৃত সমুদ্র গবেষণা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার জন্য আমেরিকা সরকার সবসময় হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখে।
পরিণতি অজানা…
পারু সুস্থ হয়ে উঠলেও নুর সাহেবের মায়ের আশ্রয় থেকে কিছুতেই আসতে চান না। কিন্তু তাকে যেতে হবেই। কেন পারু ফিরতে নারাজ? কেনই বা এত ভালোবাসার পরও পারুকে তার বাড়ি যেতে হলো?
কারণ জানতে চোখ রাখুন পরের পর্বে, শুধুমাত্র একুশে চেতনায়।